“নিজের কণ্ঠ জোরালো করো, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দাও”-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ ঢাকার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রাঙ্গণে জাতীয় যুব সম্মেলন-২০২৫ আয়োজন করেছে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) ও বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) দুদিনব্যাপী এই সম্মেলনে দেশের ৩৯টি জেলার ৩০০ জন যুবনেতা অংশগ্রহণ করেন।
এই সম্মেলনের লক্ষ্য— যুব নেতৃত্ব, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং সম্মিলিত উদ্যোগকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি ন্যাশনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক গঠনের ভিত্তি তৈরি করা, যা নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুবদের কণ্ঠস্বর জোরালো করতে একটি অভিন্ন জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পটভূমি থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন এবং অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অভিন্ন অগ্রাধিকার ও অঙ্গীকার নির্ধারণ করেন।
সম্মেলনের শেষ দিনে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায়ন বিভাগের পরিচালক তানিয়া শারমিন একটি সম্মিলিত অঙ্গীকার সেশন পরিচালনা করেন। এ সময় সব যুব অংশগ্রহণকারী আগামী ছয় মাসে কীভাবে তারা যুব নেটওয়ার্কে অবদান রাখবেন— সে বিষয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত অঙ্গীকার লিখে দেন।
সম্মেলনের প্রথম দিনে বাংলাদেশ নারী জাতীয় ফুটবল দলের তিনজন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেন এবং একটি অনুপ্রেরণামূলক সেশনে বক্তব্য দেন।
জাতীয় দলের খেলোয়াড় স্বপ্না রানী বলেন, “আপনি যদি ফুটবল না গড়ান, তাহলে গোল দেওয়া সম্ভব নয়। ঠিক তেমনি জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আপনাকে নিজে থেকে এগিয়ে আসতে হবে।”
ফরোয়ার্ড মোছা. সাগরিকা বলেন, “আপনি যা-ই করুন, মানুষ কথা বলবেই— বিশেষ করে আমাদের দেশের মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সত্য। আমি বলবো, মানুষ কী বলছে সেদিকে মন না দিয়ে নিজের লক্ষে স্থির থাকুন এবং সেটার জন্য কাজ করুন।”
ফরোয়ার্ড কোহাতি কিস্কু বলেন, “যেকোনও ক্ষেত্রে সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তবে শুধু পরিশ্রম করলেই হবে না— আপনাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। লক্ষ্য থাকলে দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার হয়, আর সেটিই সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘ইনস্পিরেশন টক’ সেশনে অংশ নেন পর্বতারোহী ও সাংবাদিক মো. মুসা ইব্রাহিম।
তিনি বলেন, “পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে যে কোনও কাজই ছোট বা বড় নয়। আজ এখানে যারা আছেন, তারা সবাই একেকজন নেতা। আপনাদের প্রত্যেকের কাছে আমার অনুরোধ— নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করুন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কাজ করে যান।”
প্রধান অতিথি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুবুল আলম বলেন, “সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ যেভাবে যুবদের একত্রিত করছে, এই নেটওয়ার্ক এখন ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুবদের সহায়তায় সরকারের একাধিক দফতর কাজ করছে। আজকের এই আয়োজনের উদ্দেশ হলো একটি যুব কণ্ঠস্বরভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরুণদের মতামত শোনা, যা তাদের সম্মিলিত শক্তিকে তুলে ধরে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আইসিটি খাতে আমাদের নীতিমালা রয়েছে, যা আপনাদের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। এগুলোই আমাদের পথনির্দেশনা, যাতে আমরা সবাই অর্থবহ অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারি। আপনাদের হতে হবে দূরদর্শী— আপনি কোথায় আছেন এবং ভবিষ্যতের পথে যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ভাবনা থাকতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক জিনাত আরা বলেন, “উৎকর্ষ সাধন ও একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার যাত্রা শুরু হয় পরিবার থেকে। আজ আমি ভবিষ্যৎ গঠনে আপনাদের পরিবারের একজন হতে চাই— আমাদের সম্মিলিত পরিশ্রমের অংশ হিসেবে। আমরা প্রতি বছর অঙ্গীকার করি, আর আজকের দিনটি আরও বিশেষ, কারণ এখানে ৩৫টিরও বেশি জেলা থেকে আসা সব লিঙ্গ ও গোষ্ঠীর যুবারা উপস্থিত। এই আয়োজন দেখিয়ে দেয়— আমরা একসঙ্গে কী কী সুযোগ তৈরি করতে পারি এবং সবাই যদি এটিকে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে সেগুলো বাস্তবে রূপ নেওয়াও সম্ভব।”
বিশেষ অতিথি সমাজসেবা অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক রতন কুমার হালদার বলেন, “এই প্ল্যাটফর্মটি আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। আমাদের আরও আগে যুবদের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। আজ আপনাদের উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়— আপনারা যদি নিজেদের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। শিশুদের জন্য পৃথিবী বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আপনাদের হাতেই, এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ আপনাদের রয়েছে যেখানে শিশুদের প্রয়োজন সবার আগে গুরুত্ব পাবে। আমরা যদি একসঙ্গে এগিয়ে যাই, আমি বিশ্বাস করি— আপনাদের প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আগামী দিনগুলো আরও ভালো হবে।”
সম্মেলনের সমাপনী সেশনে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমত উল্লাহ বলেন, “আপনাদের জীবনের এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— এটি এমন একটি সন্ধিক্ষণ, যখন আপনারা জীবনের অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করছেন। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে সঠিক জ্ঞান ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে আপনারা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন, যেখানে আপনারা সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারবেন। আমরা এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি মাত্র, এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরিতে আপনাদের মতামত ও কণ্ঠস্বর আমরা নিয়মিত শুনতে চাই— কারণ ভবিষ্যৎ গঠনে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”









