বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু নেই— এ কথা মানতে এখনো কষ্ট হয় ভক্তদের। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর চলে গেছেন রূপালী গিটারের এই জাদুকর। তার মৃত্যুর সাত বছর পূর্ণ হলেও প্রতিটি গিটার ঝংকারে, প্রতিটি বৃষ্টিভেজা গানে, আজও বেঁচে আছেন তিনি!
“ফেরারি মন”, “চলো বদলে যাই”, “রূপালী গিটার” কিংবা “কষ্ট পেতে ভালোবাসি”—প্রতিটি গানের সুর যেন হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে। সেই সুরে আনন্দও আছে, কিন্তু বেদনার ছোঁয়াটাই যেন প্রবল। শুধু এগুলো নয়, তার বহু গানেই বেদনার সুর বয়ে যায়! প্রশ্ন জাগে—আইয়ুব বাচ্চুর গানে এতো বেদনার সুর কেন?
এ বিষয়ে চ্যানেল আইয়ের ‘তারকা কথন’ অনুষ্ঠানে প্রশ্নের মুখে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুরকার এবং আইয়ুব বাচ্চুর ঘনিষ্ঠজন নকীব খান বলেন,“এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে বাচ্চুর ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকাতে হয়। তার জীবনটা কিন্তু অনেক কষ্টের ছিলো। হয়তো সবাই তা জানে না। তার ভেতরে যে বেদনা ছিলো, সেটাই গানের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন,“আমরা বাচ্চুকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। জীবনের অনেক কষ্ট, পারিবারিক সেক্রিফাইস, দায়িত্ব—সব কিছুই একা সামলেছে সে। পরিবারে অনেক সেক্রিফাইস করেছে, যা অন্য কেউ করলে হয়তো টিকে থাকতে পারতো না। সেই অভিজ্ঞতাই তার গানে বেদনার আবরণ তৈরি করেছে। সেই কষ্টই তাকে সংবেদনশীল করে তুলেছিলো।”
তার আরেক ঘনিষ্ঠজন ও ব্যান্ড শিল্পী নাসিম আলী খান বলেন,“সে ছিলো বঞ্চিত একটি ফ্যামিলির সন্তান। মাকে নিয়ে নানার বাসায় থাকতো। ছোট দুই ভাইকে সেখানেই লেখাপড়া করাতো। তার বাবার আরেক পরিবার ছিলো, যা তাকে ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে আঘাত দিয়েছিলো।”
তিনি আরও বলেন,“এসব বিষয়েই তার ভেতরে প্রচণ্ড অভিমান জন্মায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জীবনের শেষ দিকে সে সেই অভিমান ভুলে গিয়েছিলো। বাবার জন্য প্রচণ্ড করেছে। ভেতরে কষ্ট রেখেও কাউকে কষ্ট দিতে চায়নি। আমার মনে হয়, আইয়ুব বাচ্চুর ইমোশন, তার ভালোবাসা— সবকিছুই এসেছে এই গভীর কষ্ট আর বঞ্চনা থেকে।”
দেশীয় ব্যান্ড সংগীতকে মূলধারায় নিয়ে আসার অন্যতম কারিগর ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আশির দশক থেকে নব্বই ও দুই হাজার দশকের প্রতিটি প্রজন্ম তাকে ভরসা, অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখেছে।
এ প্রজন্মের আইয়ুব বাচ্চু পাঠ নিয়ে নকীব খান বলেন,“এই প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে বাচ্চুর কাছ থেকে। সবচেয়ে বড় শেখাটা হলো তার নিবেদন— তার যে অবদান সংগীতজগতে, সেটা কেবল বাজানোর ভেতর সীমাবদ্ধ না। আমাদের ‘সোলস’-এ যখন আইয়ুব বাচ্চু বাজানো শুরু করে; তখনকার বাচ্চু আর দশ–বিশ বছর পরের বাচ্চুর মধ্যে কিন্তু আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমারতো মনে হয় সে ঘুমাত গিটার নিয়ে, গান গাইতো গিটার নিয়ে, খেত গিটার নিয়ে। এমন একনিষ্ঠ সাধনা কিন্তু সংগীত নিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর ছিলো। এজন্যই বলি, আইয়ুব বাচ্চু হতে হলে যে সাধনা দরকার; সেটাও যেন এ প্রজন্মের শিল্পীরা মাথায় রাখেন। এটা এক দিনের ব্যাপার নয়। শর্টকাটে হয়তো তারকা হওয়া সোজা, কিন্তু সত্যিকারের শিল্পী হতে হলে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার প্রয়োজন আছে। সেটা আইয়ুব বাচ্চু প্রমাণ করে গেছেন।”
এসময় তিনি আরো বলেন,“আমি আরও বলব বাংলা গানে যারা কাজ করেছেন— আমাদের লাকী আখান্দ, হ্যাপি আখান্দ, সবার অবদান আছে। সেখানে বাচ্চুর নাম অবশ্যই আসবে। কারণ তিনি শুধু গিটারিস্ট নন- তিনি গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী; একজন ব্যান্ড সংগীতের সম্পূর্ণ মানুষ।”









