মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর যেভাবে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, ঠিক পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আহতদের সংখ্যাও। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে আহতদের ভিড়ও। বিপুল সংখ্যক রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে উদ্ধার ও চিকিৎসা সরঞ্জামে।
রোববার (৩০ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূমিকম্পে শুধুমাত্র মিয়ানমারে এক হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
হতাহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা সেবা এখন সবচেয়ে জরুরি। তবে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে দেশটির সরকারকে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে উদ্ধারকারীরা যখন জীবিতদের সন্ধান করছেন তখন জাতিসংঘ চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র অভাবের কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘ সূত্রে বিবিসির প্রতিবেদন বলা হয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে, যা ত্রাণ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।
ভূমিকম্পে রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর সঙ্গে সামরিক সরকার, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সশস্ত্র যোদ্ধাদের মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে কাজ করা সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অভাব রয়েছে সরঞ্জামেরও।
সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধার অভিযানও ব্যাহত হচ্ছে
মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভূমিকম্পে বহু ভবন ও সেতু ভেঙে পড়েছে, রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়েছে এবং অঞ্চলজুড়ে পরবর্তী কম্পনও অনুভূত হয়েছে। তবে যন্ত্রপাতির অভাবে সেই তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলো তাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ এবং যথাযথ সরঞ্জামের অভাব দেখে তারা হতাশ।
উদ্ধারকর্মী ওয়াই ফিও বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছে। আমরা তাদের জীবিত উদ্ধারের আশা করছি। কিন্তু আশা ততটা উজ্জ্বল নয়। উদ্ধার তৎপরতায় যোগাযোগও একটি সমস্যা। কারণ তাদের কাছে ফোন লাইন নেই। ইন্টারনেটের অ্যাক্সেসও প্রায় অসম্ভব ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মান্দালয়ের উদ্ধারকর্মীদের ধ্বংসাবশেষ সরাতে বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রপাতি ধার করতে হয়েছে। কিছু বাসিন্দা উদ্ধার প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য সরঞ্জামের অনুদানের জন্য ফেসবুকে আবেদন করেছেন।
প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সহায়তা
এরইমধ্যে বিধ্বস্ত এই দেশটিতে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত ও বাংলাদেশ থেকে উদ্ধারকর্মী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সহায়তা পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারে ১৬ দশমিক ৫ টন ওষুধ, তাঁবু ও ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মহাপরিচালক (অপারেশন ও প্ল্যানিং) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলিমুল আমীন এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, পানি ও বাসস্থান সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসার অভাবে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশ মর্মাহত।

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত মিয়ানমারে ত্রাণ এবং উদ্ধারকাজের জন্য বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ভারত। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ব্রহ্মা অভিযান (অপারেশন ব্রহ্মা)। শনিবারই ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মায়ানমারের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে ভারতীয় নৌসেনার দু’টি জাহাজ।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য ভারতীয় সেনার বিশেষ অস্থায়ী হাসপাতাল (ফিল্ড হসপিটাল)-ও পাঠানো হচ্ছে। ওই অস্থায়ী হাসপাতালে ভূমিকম্পে আহতদের জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য যাচ্ছে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী-সহ ১১৮ জনের একটি দল। এছাড়া জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৮০ জনের একটি দলকে মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছে উদ্ধারকাজে সাহায্য করার জন্য।
ভারতীয় নৌসেনার জাহাজ আইএনএস সাতপুরা এবং আইএনএস সাবিত্রীর সোমবারের মধ্যে ইয়াঙ্গনে পৌঁছে যাওয়ার কথা। শনিবার ভোরেই ১০ টন ত্রাণ নিয়ে প্রথম জাহাজটি রওনা দিয়েছে মায়ানমারের উদ্দেশে। পরে আরও ৩০ টন ত্রাণ নিয়ে দ্বিতীয় জাহাজটি রওনা দেয় শনিবার বিকেলে। দু’টি জাহাজ মিলিয়ে ৪০ টন ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে ভারত থেকে।









