জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ডেপুটি রেজিস্ট্রার বি. এম. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের আল্টিমেটাম দিয়ে বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জানানোর পরে তা সিন্ডিকেট মিটিংয়ে উঠতে যাচ্ছে। অভিযুক্ত ডেপুটি রেজিস্ট্রার অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে ইনক্রিমেন্ট নেওয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া নিয়ে ঝামেলা তৈরি করা, অসুলভ আচরণ করা, আপগ্রেডেশন ফাইল আটকে রাখা, স্বজনপ্রীতি বা পছন্দের লোককে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এ ডেপুটি রেজিষ্ট্রারের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সমাবর্তনের নিমন্ত্রণপত্র, খাম, ফটোবুথ ও ব্যানারে ব্যবহৃত আলোকচিত্র বিনা অনুমতিতে ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন এই কর্মকর্তা। আলোকচিত্রের স্বত্বাধিকারী এ এস এম মাহবুবুল আলম এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলমের কাছে অভিযোগ করেছেন।সমাবর্তনের দাওয়াত পত্র ও নিমন্ত্রণ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন বি.এম কামরুজ্জামান। আলোকচিত্রী মাহবুব উক্ত বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট কমিটির ভুল স্বীকার করা, তার কাজের স্বীকৃতি, মূল্যায়ন ও সম্মানী প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
মাহবুবুল আলম বলেন, ‘অনুমতি না নিয়ে আমার ছবি ব্যবহার করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট কমিটিকে ভুল স্বীকার করার আহ্বান জানাই। কিন্তু তারা ভুল স্বীকার করেনি বরং আমাকে যে চিঠি দেয়া হয়েছে সেটাতে ‘আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে’ উল্লেখ করে টাকা দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। তারা ভুল স্বীকার করলে বিষয়টি ভালো লাগতো।’
আরো জানা যায়, একজন উচ্চমান সহকারী মহিলা কর্মচারীর পদোন্নতির সুবিধা দিতে করোনার অজুহাতে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি করেছিলেন।
রেজিস্ট্রার অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘উচ্চমান সহকারী থেকে ঊর্ধ্বতন সহকারী হওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ২০২০ সালের ১২ জুলাই এবং আবেদনের ডেডলাইন ছিল ২৫ জুলাই পর্যন্ত। কিন্তু এর পরেও নভেম্বর মাসে করোনার অজুহাতে কোনরকম পুনঃ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এক মহিলার আবেদন গ্রহণ করা হয়। এসব কিছু কামরুজ্জামান সাহেব তার ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে করেছেন।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বাজেট পরিদর্শন টিম কর্তৃক ২০২২-২৩ অর্থবছরের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে বি.এম কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সেখানে বলা হয়, কামরুজ্জামান মাস্টার্স ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূতভাবে সমমানের ডিগ্রি এমবিএ অর্জনের জন্য অতিরিক্ত ডাবল ইনক্রিমেন্ট নিয়েছেন। এছাড়াও চাকুরি সংশ্লিষ্ট না হলেও ইতিহাসের উপর পিএইচডি করে আরও দু’টি ইনক্রিমেন্ট ম্যানেজ করেন তিনি। ইনক্রিমেন্টের জন্য তিন বছরে তিনি প্রায় দেড় লক্ষ টাকা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
কাউন্সিলের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও আপগ্রেডেশন সংক্রান্ত ফাইল আটকে দেয়াসহ নানা ঝামেলা তৈরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বি.এম কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে চরিত্র স্খলনের অভিযোগ করেছেন প্রশাসনের একাধিক কর্মচারী-কর্মকর্তা।
২৮ মার্চ এই ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে অন্যত্র বদলির দাবি জানিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলমের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা। দাবি বাস্তবায়িত না হলে আগামীকাল (২ এপ্রিল) সকাল হতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অফিসে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং নতুন প্রশাসনিক ভবন অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, ‘কর্মকর্তারা কামরুজ্জামানের বিষয়ে কিছু অভিযোগ করেছেন। ওনার বদলিসহ কয়েকটি বিষয়ে তারা দাবি তুলেছেন। আমি কামরুজ্জামানের বদলির বিষয়টি বাদে বাকি দাবিগুলো পরবর্তী সিন্ডিকেটে লিখিতভাবে উত্থাপন করবো। আর উনাকে বদলির ব্যাপারে আমি কয়েকদিন সময় চেয়েছি, আলোচনা করে কি করা যায় তা দেখবো। কাউকে বদলি করতে হলেতো সময়ের প্রয়োজন।’ এছাড়াও বিনা অনুমতিতে সমাবর্তনের কাজে অন্যের ছবি ব্যবহার করা ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন উপাচার্য।
এর আগেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য গণমাধ্যমে সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল কামরুজ্জামান। এতো অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে থাকায় কামরুজ্জামানকে রেজিস্ট্রার অফিসের ‘ডন’ বলে অভিহিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বি.এম. কামরুজ্জামানকে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।








