দীর্ঘদিন ধরে লিভার ক্যানসারে ভুগছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। সবশেষ গত ২৩ জুলাই শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। সেখান থেকে আর ফেরানো গেল না এই শিল্পীকে।
মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জুয়েল। তার মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনে স্বভাবতই বিরাজ করছে শোক। তার বন্ধু স্বজন থেকে শুরু করে সবার মুখে জুয়েলের গুণগান। ঘুরে ফিরেই আসছে তার সংগীত প্রতিভার কথা। বিশেষ করে নব্বই দশকে তার শ্রোতাপ্রিয়তা নিয়েও স্মৃতিচারণ করতে দেখা গেছে প্রবীনদের।
চিলেকোঠায় এক দুপুরে, কোথায় রাখ আমাকে, ওগো চন্দ্রদ্বীপের মেয়ে, জানি না মনে রাখ কিনা কিংবা ফিরতি পথের মতো বহু জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। তবে সব ছাপিয়ে জুয়েলকে সবাই চিনতেন ‘সেদিনের এক বিকেলে’ গানটির জন্য। এমনকি গানের সাথে মিলিয়ে তাকেও ডাকাও হতো ‘এক বিকেলের জুয়েল’ বলে! গানটি নিয়ে জুয়েল নিজেও ভীষণ মুগ্ধ ছিলেন!
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন আয়োজনে পুনরায় গানটি রেকর্ড করে ভিডিও আকারে প্রকাশ করা হয়। গানটি পরে জুয়েল তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলেও আপলোড করেন। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন ‘সেদিনের এক বিকেলে’ নিয়ে ইতিহাসও।
গানটি নিয়ে জুয়েল লিখেছিলেন,‘সেদিনের এক বিকেলে’-এক বিষণ্ণ বিকেলের গান এর গল্প । ১৯৯৪ সালে আমার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘এক বিকেলে’ বের হয়। তার আগে ‘কুয়াশা প্রহর’ বের হয়েছিলো। কিন্তু বাংলা গান এর যুবরাজ আইয়ুব বাচ্চু তার অসাধারণ সুর আর সংগীতে এই গান তৈরি করে আমার মত ক্ষুদ্র গায়ককে হঠাৎ করে ‘এক বিকেলের জুয়েল’ বানিয়ে দিলেন। ‘সেদিনের এক বিকেলে’ হয়ে গেলো জুয়েল এর সিগ্নেচার সং।
স্মৃতিচারণে জুয়েল আরো লিখেন,“তখন এতো চ্যানেল, ইউটিউব, ফেসবুক কিচ্ছু ছিল না। নিউজ কাভারেজ পাওয়া যেত না। বিটিভিতে একটা গান প্রচার হওয়া আমার মত নতুন গায়কের জন্য আকাশের চাঁদ হাতে পাবার মত ছিল। কিন্তু গান প্রিয় শ্রোতারা ক্রমে ক্রমে আপন করে নিলেন এই গান আর মফস্বল থেকে আসা এক স্বপ্নবাজ শিল্পীকে।”
গানের রেকর্ডিং সময়ের কথা উল্লেখ করে জুয়েল বলেন,“গানটা যেদিন অডিও আর্ট স্টুডিওতে রেকর্ড হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ এর অন্যতম রেকর্ডিং কুশলী পান্না আযম ভাই ট্রাকটা ধারণ করছিলেন। তিনি আমাকে চেনেন না। বললেন-‘যদি এই গানটি ঠিক করে গাইতে পারো, শ্রোতারা তোমাকে চিনে নেবে’। ভীষণ আবেগ নিয়ে গেয়েছিলাম। বাচ্চু ভাই আশাবাদী ছিলেন আমি পারব। কী পেরেছি জানি না, কিন্তু গানটি ৯০ দশকের ভালো গানগুলোর অন্যতম হয়ে গেছে সেটা নিশ্চিত।”
নতুন আয়োজনে গানটি তৈরীর কারণ জানিয়ে সেসময় জুয়েল লিখেছিলেন,“এরপর পার হয়ে গেছে ২৩ বছর। কিন্তু এখনো জুয়েল এক বিকেলের জুয়েল হয়ে হাজারো শ্রোতাদের কাছে। নতুন প্রজন্মর অনেকে গানটা চেনে দেখে সুখে বুক ভরে ওঠে। প্রযুক্তি, রুচির কারণে এখন গানের ধরনে অনেক পরিবর্তন। তাই ভাবলাম গানটির একটা অন্য ভার্সন করবো এখনকার সময়ের ইমোশনটা ধরার জন্য। এটাও দেখতে চেয়েছিলাম সমসাময়িক একজন মিউজিশিয়ান তখনকার আবেগকে কী ভাবে এসময়ে ধারণ করে। ২০১৫ -তে অডিওটা করা।”

‘সেদিনের এক বিকেলে’র গান ভিডিও নিয়ে এই শিল্পী বলেন, “এই গল্পটা আরও আবেগের। আমার মূল পেশা টিভি অনুষ্ঠান/ তথ্যচিত্র নির্মাণ সেই ১৯৮৬ থেকে। এই কয় বছরে হাজারো কাজের কারণে ওই ইন্ডাস্ট্রির শত শত সহকর্মী আর বন্ধু তৈরি হয়েছে। আমি ভাগ্যবান তাঁদের সবাই আমাকে শর্তহীন ভাবে ভালবাসেন। ঢাকার অন্যতম পেশাদার প্রোডাকশন হাউস টাইম লাইন এর কর্ণধার ইফতেখার আলি ডন আমার দীর্ঘদিনের প্রাণের মানুষ। সে হঠাৎ আমাকে একদিন বলল তার খুব ইচ্ছা আমার পছন্দের একটা গান এর মিউজিক ভিডিও তৈরি হোক। আমরা যারা এতদিন একসাথে কাজ করেছি তাঁদের মধ্যে এই ভিডিও তৈরিতে দরকার এমন যারা যারা ভালবেসে, বিনা পারিশ্রমিকে এই কাজে থাকতে চান তাঁদের এক সাথে করলো সে। এই অডিওটি তৈরি ছিল। সেপ্টেম্বর ২০১৬ এর এক চমৎকার দিনে আমি সজল চোখে ৩০ জন সহকর্মী , বন্ধুদের অসাধারণ ভালবাসায় সিক্ত হলাম। আর এই মিউজিক ভিডিওটি তৈরি হল। ভিডিওটি হালের ভিডিও গুলোর মত অত বিশাল আয়োজনের বা চকমকে নয়, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির সেরা সেরা মানুষগুলো, কোন এক আবেগে সময় দিয়ে গেলেন ডন এর আমন্ত্রণে, আমার জন্য।”









