বাংলাদেশের সিনেমা হল আবারও বড় ধাক্কায় পড়ছে। ঈদ ছাড়া সারা বছর দর্শক টানতে না পারায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ। সবচেয়ে ভুক্তভোগী সিঙ্গেল স্ক্রিন! কিন্তু এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে দুটি আধুনিক সিনেমা হল— ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের লায়নস সিনেমাস ও বগুড়ার মধুবন।
একসময় যেগুলোকে নতুন প্রজন্মের বিনোদনের ভরসা বলা হচ্ছিল, আজ সেগুলোও দর্শক সংকটে টিকে থাকতে পারছে না।
ঢাকার বাইরের অত্যন্ত সু-সজ্জিত সিনেমা হল হচ্ছে বগুড়া শহরের পৌরসভা এলাকার মধুবন সিনেপ্লেক্স। ২০২১ সালে আধুনিকভাবে মধুবন চালু করা হলেও শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) থেকে ‘একেবারে বন্ধ’ করে দেয়া হচ্ছে আধুনিক এই প্রেক্ষাগৃহটি।
মধুবন সিনেমা হলের মালিক রোকনুজ্জামান ইউনূস বৃহস্পতিবার বিকেলে চ্যানেল আই অনলাইনকে খবরটি জানান।
আক্ষেপ নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বলেন, মধুবন ‘একেবারে বন্ধ’ রাখছি। সিনেমা হল ভেঙে ওখানে কী বানাবো এখনও সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারিনি। মাসের পর মাস এত লস খেয়েছি যে এই ভার বইতে পারছি না। আজই শেষদিন। এ সপ্তাহে ‘নন্দিনী’ ছবি চালাচ্ছিলাম। কিন্তু দর্শক পাইনি। ছবি চালালে যে খরচ হয়, সেটাও তুলতে পারিনা।
তিনি বলেন, “প্রতিমাসে সবমিলিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ আছে। সিনেমা চালিয়ে ব্যবসা না হলে কীভাবে এই খরচ তুলবো? আমার ইচ্ছে একেবারে বন্ধ থাকবে। তবুও দেখবো নির্বাচিত সরকার আসা পর্যন্ত। তার আগে আর চালু করবো না। ওদিকে মনিহার বন্ধ হচ্ছে, আগামীকাল থেকে আমি মধুবন বন্ধ করে দিচ্ছি। আগামী মাসে লায়ন সিনেমাও বন্ধ করে দেবে। আগামী সপ্তাহে আমরা প্রেস কনফারেন্স করে জানাবো।“

রোকনুজ্জামান ইউনূস বলেন, আমাদের দেশের সিনেমা যেখানে ঈদ ছাড়া দর্শক টানতে পারছে না। তাই আমরা চেয়েছিলাম বাইরের সিনেমা দিয়ে সিনেমা হল সচল রাখবো। বিদেশি ভালো সিনেমাগুলো চালাতে পারলে দর্শক হলে আসা অব্যহত রাখতো, সেই প্রতিযোগিতায় আমাদের সিনেমাগুলোও ভালো চলতে পারতো। কিন্তু ইন্ডিয়াসহ অন্যান্য সিনেমা আসা একেবারে বন্ধ। এই অবস্থায় আর লোকসান টানা সম্ভব না।
মধুবন সিনেপ্লেক্সের আসন সংখ্যা ছিল ৩৩৬টি। নির্মাণের পর এই হলেই পরাণ, হাওয়া, প্রিয়তমা, তুফান, বরবাদ সিনেমাগুলো রমরমা ব্যবসা করে। এমনকি পরিবার নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শকদের জন্যেও সর্বশেষ ‘বরবাদ’ সিনেমায় একাধিক দিন ‘মিড নাইট’ চলেছিলো মধুবনে।
এদিকে রোকনুজ্জামান ইউনূসের কথার সূত্র ধরে কথা হয় লায়ন সিনেমাস এর কর্ণধার মির্জা আবদুল খালেকের সঙ্গে। রাজধানী ঢাকার অদূরে সবচেয়ে আধুনিক ও মান সম্পন্ন সিনেমা হল বলা হয় লায়ন সিনেমাস-কে, চারটি স্ক্রিন নিয়ে যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালে।
সত্যিই কি এটিও বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন?
এমন প্রশ্নে মির্জা আবদুল খালেকের কণ্ঠেও হতাশা আর আক্ষেপ ঝরে পড়লো। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, কবে থেকে সিনেমা হলটি বন্ধ করবো, সে অপেক্ষায় আছি। বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখছি না। সিনেমা হলের কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না।
বর্তমানে লায়ন সিনেমাসে ‘ডেমন স্লেয়ার’-এর নতুন সিক্যুয়ালসহ দুটি ইংরেজি সিনেমা এবং একটি বাংলা সিনেমা চলছে বলেও জানান মির্জা খালেক। তবে এগুলোকে ‘না চলার মতো’ বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
লায়ন নিয়ে কী পরিকল্পনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,“লায়ন একেবারে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” এটা কি অভিমান থেকে, নাকি শুধু ঈদের সময় চালু করবেন- এমন প্রশ্নে মির্জা খালেক বলেন, “না, অভিমান থেকে নয়। এখন আর টানতে পারছি না। গত ঈদের পর থেকে প্রতি মাসে ১৫ লাখ টাকা করে লস দিয়ে যাচ্ছি। আর কতো টানা যাবে, আর টানতে পারবো না। এসব কারণে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি যে, লায়ন একেবারে বন্ধ করে দেব।”

তবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও নিজেদের সংকট নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানান আবদুল খালেক। তিনি বলেন,“এই সেক্টর (সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি) নিয়ে যে কেউ আলোচনা করবে, সেটার প্রতি কারো কোনো আগ্রহই নাই। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী আমরা হল মালিকরা কয়েক দফায় তথ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি, কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি। এসব দেখে মনে হয়েছে, এই সেক্টর থাকুক বা না থাকুক- এটা নিয়ে কারো কিছু আসে যায় না।”
নিজের সংকটের কথা জানিয়ে লায়নের এই কর্ণধার বলেন,“নতুন হল যারা করেছেন আমার মতো, তাদের সমস্যাটা একটু বেশী। লোন নিয়ে এটা করা, অলরেডি আমি ব্যাংকের ডিফল্টার হয়ে গেছি। কয়দিন পর দেখা যাবে, ক্রুকের নোটিশ এসে বসে আছে। অযথা এসব ঝামেলায় যেতে চাই না। যেহেতু আর টানতে পারছি না, তাই বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নাই। লোন না থাকলে হয়তো অন্য চিন্তা করা যেতো।”
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে লায়ন বন্ধ করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, লায়ন বন্ধের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছি। কাগুজে অনেক বিষয় আছে এটা বন্ধ করতে, সেগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি। বড় করে প্রেস কনফারেন্স করে লায়ন বন্ধের ঘোষণা দেব।









