শাহিন রেজা শিশির: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দুটো স্লোগানই মূলত চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম হাতিয়ার ও প্রেরণার উৎস। স্লোগান দু’টি হলো: ‘বাংলাদেশ যাবে কোন পথে- ফয়সালা হবে রাজপথে’, ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ- যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ’।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনা নির্বিচারে যখন এদেশের ছাত্রসমাজকে নৃশংসভাবে হত্যা শুরু করল, তখনই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এই স্লোগানকে ধারণ করে জাতীয়তাবাদী শক্তি ছাত্র-সমাজের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে তারেক রহমান কথা বলে এই স্বৈরাচার হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন। মূলত এই আন্দোলনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজকে বাংলাদেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে এটা তারেক রহমানের মেধা, কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতার ফলেই।
একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন সরকার দলীয় ক্যাডারদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা স্বচক্ষে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট ১৭ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এ সময়টা জাতীয়তাবাদী শক্তির সবাই তারেক রহমানের নির্দেশ মোতাবেক রাজপথে ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আমিও ছিলাম।
৪ আগস্ট। আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্পট রাজধানীর মোহাম্মদপুর। সকাল ছয়টার মধ্যেই সহযোদ্ধাদের নিয়ে বেড়িবাঁধ চার রাস্তার মোড়ে অবস্থান নিলাম, যার চারপাশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও র্যাব পুলিশের ব্যাপক অবস্থানের মধ্যে যানবাহন সচরাচর চলছে। নিজেকে মানসিকভাবে স্থির করলাম যেকোনো মূল্যেই হোক যানবাহন বন্ধ করে এখানে একটি আন্দোলনমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাৎক্ষণিক চলে গেলাম বসিলার রাস্তায়, সাথে ছিল মোহাম্মদপুরের স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজাদ, ছাত্রদল নেতা বসির উল্লাহ বসির ও আব্দুর রাজ্জাক রাজ, সাইফুল। আমি রাস্তার মাঝখানে তিনটি টায়ার জ্বালিয়ে দিলাম যার আগুনের কালো ধোঁয়া চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আমার রাজনৈতিক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ম্যাসেজ দিয়ে সবাইকে এখানে আসতে বলি, মুহূর্তেই তেজগাঁও কলেজের সাকিল, বিল্লাল আকন, আদাবরের সাদ্দাম, মোহাম্মদপুরের ছাত্রনেতা সাইফুল, নাঈম খান, আবির ইসলামসহ ১০-১৫ জন অবস্থান নেই এবং মিছিলে নিয়ে চার রাস্তার মোড়ে আসলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশসহ অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই চার রাস্তা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, আমাদের সাথে মিছিলে সামিল হয় সাধারণ জনগণ শুরু হয় তুমুল প্রতিরোধ। দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে, অপর প্রান্ত থেকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা, পুলিশ র্যাব বৃষ্টির মতো গুলি ও বোমাবর্ষণ করতে থাকে আর আমরা এ প্রান্ত থেকে ইট পাটকেল মারতে থাকি। হঠাৎ আত্মচিৎকারে তাকিয়ে দেখি সিকদার সুজ দোকানের সামনে গুলিতে একজনের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তার একটু সামনে একজন পড়ে আছে তার বুকে গুলি লেগেছে। ডানপাশে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখি আরেকজন- এ যেন এক বিভীষিকাময় পরিবেশ।
আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশসহ গুলি করতে করতে আমাদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু সহযোদ্ধাদের রেখে কিভাবে যাই, বৃষ্টির মতো গুলি আর টিয়ারগ্যাসের মধ্যে থেকে জীবন বাজি রেখে সহযোদ্ধাদের রিকশাযোগে সিকদার মেডিকেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই এবং চারপাশে তাকিয়ে দেখি প্রায় শতাধিক মানুষ পুলিশের ছড়া গুলিতে গুরুতর আহত এবং তাদের শরীর রক্তে লাল হয়ে আছে, অনেকে আবার টিয়ার গ্যাসে অজ্ঞান হয়ে পরে আছে কারও আবার রাবার বুলেটের আঘাতে শরীরের ভিবিন্ন স্থান ব্যাপকভাবে ফুলে আছে। স্লোগান দিয়ে সবাইকে ইউনাইটেড করার চেষ্টা করি। একটু পরেই পাশে থাকা মাদরাসার ছাত্ররাসহ আমাদের সাথে অবস্থান নেন ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল হাসান রাজ, উত্তরের সালাউদ্দিন ভাই, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা মিথুন, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম রাসেল ও আদাবর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মোজাম্মেল হক ভাই, মোহাম্মদপুরের যুবদল নেতা দোলন ভাই, নাসির উদ্দিন বিশ্বাস, আকতার সিকদার, মঈনসহ অসংখ্য ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী। শুরু হয় আমাদের পাল্টা আক্রমণ, আমাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে আওয়ামী সন্ত্রাসী কমিশনার আসিফ, তারেকুজ্জামান রাজিব, বিপ্লব, রাসেল ও ইমনসহ পুলিশ বাহিনী পিছু হটে অবস্থান নেয় আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে।
এখন চার রাস্তার মোড় থেকে বিসমিল্লাহ হোটেল পর্যন্ত আমাদের দখলে, চলছে তুমুল লড়াই। আমাদের অবস্থান বিসমিল্লাহ হোটেলের সামনে। হঠাৎ সেনাবাহিনীর পাঁচটি গাড়ি চলে এসেছে সেনাবাহিনী দেখে আমি স্লোগান দেওয়া শুরু করলাম এই মুহূর্তে দরকার সেনাবাহিনী সরকার। তখনই পুলিশ ও র্যাব আমাকে টার্গেট করে সরাসরি গুলি করে। আমার ডানপাশে থাকা সবুজ মুন্সি (বাড়ি লালমোহন, ভোলা) শিশির ভাই বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঠিক ওর চোঁখের কোনায় গুলিটা লেগেছে, তারই পিছনে পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলে পড়ে আছে, যার বুকসহ সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে আছে।
একপর্যায়ে আমি সবুজকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। ঠিক তখনই একটা রাবার বুলেট আমার মাথার পিছনে আর একটা পেটের ওপর পড়লে আমিও আচমকা মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ি। কিন্তু আমি পুরোপুরি অজ্ঞান নই। আমি দেখলাম আমার পাশে কেউ নেই, সবাই দৌড়ে ময়ূর ভিলার দিকে চলে যাচ্ছে এবং কমিশনার আসিফ অস্ত্র ও গ্রুপসহ আমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এরমধ্যে কয়েকটি টিয়ারগ্যাস আমার সামনে এসে পড়ল, গ্যাস আর রাবার বুলেটের প্রতাপে আমার নিঃশ্বাস নেওয়া ছিল অসম্ভব। মনে হয়েছিল আমি মৃত্যুশয্যায়।
কোনোরকম একটু দৌড়ে কাটাসুরের গলিতে গেলে তখনই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাকে ধরে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। কিন্তু গলির মুখে থাকা মহিলা ও সাধারণ জনগণের প্রতিরোধে মুখে তারা মেইন রাস্তায় চলে যায়। পরবর্তীতে মহিলারা আমাকে উদ্ধার করে রাস্তার পাশেই তাদের বাসায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আমি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসলে দেখি আমার মুখ ও বাম পাশের চোখের ভ্রমর থেকে রক্ত বের হচ্ছে এবং হাত, পায়ের বিভিন্ন স্থানে, পিঠে ব্যাপক রক্তের দাগ। এতগুলো ছররা গুলি আমার শরীরে লেগেছে আমি টেরই পেলাম না।
এক মুরুব্বী এসে বললো গলির মাথায় অস্থায়ী একটা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, আপনি সেখানে চলেন। রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে। সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের অসংখ্য সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তারমধ্যে অন্যতম মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম রাসেল ভাই, যার মাথায় থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে। ছররা গুলি আর রাবার বুলেটে মাথা ফেটে গেছে তার। দুজন এক সাথেই চিকিৎসা নিলাম।কিছুক্ষণ পর আমি ২০-২৫ জন সহযোদ্ধা নিয়ে মিছিলসহকারে বিসমিল্লাহ হোটেলের সামনে যাই। যেখানে আমি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী দ্বারা নির্মম আঘাতের শিকার হই। সেখানে গিয়ে শুনতে পেলাম তারা একটি শিশুকে বুকে পাড়া দিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে। এবার আমাদের অবস্থান ময়ূর ভিলার সামনে সাথে আছে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি সিরাজউদ্দীন বাবু। আমাদের স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠলো রাজধানীর মোহাম্মদপুর।
এবার আমাদের মিছিল টার্গেট করেই হেলিকপ্টার থেকে র্যাব গুলিবর্ষণ, টিয়ারগ্যাস ও বোমা মারতে শুরু করল। আমরাসহ উপস্থিত জনতা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করলাম একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। উপর থেকে গুলি বর্ষণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠলো রাজধানীর মোহাম্মদপুর। এভাবে চলছে রাত তিনটা পর্যন্ত আমাদের মুখোমুখি ভয়ংকর যুদ্ধ। পরিবেশ একটু নিরব হয়ে আসলে আমরা চার রাস্তার মোড়ের চারদিকে বেষ্টনী দিয়ে অবরোধ করে রাখি।
এভাবেই রাত পেরিয়ে হয় সকাল। ক্লান্ত শরীর। শুরু হয় আগের মতোই সংঘর্ষ। আমরা বারবারই মিছিল নিয়ে গণভবনের দিকে আসার চেষ্টা করি। অবশেষে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে এবং আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশকে প্রতিহত করে টাউন হলে আসলে আবারও সংঘর্ষ হয় টাউন হলে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সাথে। আমরা তাদেরকেও প্রতিহত করে মিছিল নিয়ে সোজা আসাদগেট চলে আসি। পিছনে তাকিয়ে দেখি হাজার হাজার জনতা আমাদের পিছনে। আমরা গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকি কিছুক্ষণ পরেই লক্ষ লক্ষ জনতা গণভবনের চারপাশে অবস্থান নেয়। সবার মুখেই অফুরন্ত আনন্দময় বিজয়ের হাসি। স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে যেন নতুন এক বাংলাদেশের সৃষ্টি হলো।
আমরা বায়ান্ন দেখিনি। বাষট্টি দেখিনি। দেখিনি একাত্তর কিংবা নব্বই। তবে ইতিহাসের এই আন্দোলনগুলোই আমাদের প্রেরণার উৎস। একাত্তর ও চব্বিশ এর গণহত্যাকারীরা এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচার যেন ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত থাকে, তাহলেই গড়ে উঠবে একটি স্বচ্ছ ও নতুন বাংলাদেশ।
২০০৮ সালে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি নির্বাচন, পরবর্তীতে চৌদ্দ-আঠারো ও চব্বিশে একতরফা নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীর উদ্ভট কথাবার্তা, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গুম-খুন-রিমান্ডের নামে নির্যাতন, বিদেশে টাকা পাচার, জনগণের ভোটাধিকার হরণ- এগুলোর জন্য গত ষোল বছর জনগণের চাপা ক্ষোভই যেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর রাজনীতি হোক দেশ ও জনগণের। একাত্তর ও চব্বিশকে ধারণ করেই আমরা নতুন প্রজন্ম চাই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। অসংখ্য শহীদ পরিবারের সাথে কথা বলেছি, সবাই এই প্রত্যয়ই ব্যক্ত করেছেন।
লেখক: যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









