মাখফি অর্থ লুকানো বা গোপন। তবে এই ছদ্মনামের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারেননি সুফি কবি ও শাহজাদি জেব-উন-নিসা। দীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরেই তার কাব্যপ্রতিভা ও জীবন নিয়ে উৎসুক গবেষক ও অনুরাগীরা।
ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, দানশীল ও আধ্যাত্মিক পথের অনুসারী। শিল্পসাহিত্যের প্রতি মোঘল রাজবংশের অনুরাগ পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে।
শাহজাদি জেব-উন-নিসার জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৯ সালে। মহারাষ্ট্রের দৌলতাবাদে। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর কন্যা। মা দিলরস বানু বেগম। জ্যৈষ্ঠ সন্তান।
মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর থেকে ভারতবর্ষের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ প্রত্যেকেই কাব্যানুরাগী ছিলেন। তারা উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা করতেন। তবে আওরঙ্গজেব ছিলেন কট্টর সুন্নি। কাব্যচর্চ্চা না করলেও আইন বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। জেব-উন-নিসা তার সময়ের বিশিষ্ট সুফিদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। ছিলেন কবি ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষক। বইয়ের সংগ্রহশালা ছিল তার।

শৈশবে জেবুন্নেসার কোরআনে হিফজ সমাপ্ত হলে সম্রাট খুশি হয়ে কন্যাকে ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন। আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী জেব-উন-নিসা মূলত লিখতেন গজল ও রুবাই। ফার্সি ভাষায়। তার সব গজল ও রুবাই সুফি ভাবধারায় রচিত। তার কাব্য সংকলন দিওয়ান -ই-মাখফি নামে পরিচিত। সেখানে পাঁচশ গজল ও কিছু কবিতা রয়েছে। মৃত্যুর ৩৫ বছর পর এই দিওয়ান প্রকাশিত হয়।
১৭২৪ সালে ভারত ও পারস্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু গজল ও রুবাই উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে ৪২১টি রুবাই ও গজল নিয়ে সঙ্কলিত হয়েছিল ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’। এটি এখন দুষ্প্রাপ্য। দিওয়ান-ই মাখফির প্রথম মুদ্রিত সংস্করণটি ১৮৫২ সালে কানপুরে লিথোগ্রাফ আকারে প্রকাশিত হয়। বইটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, কানপুর, লখনৌ ও লাহোরে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল।
১৯১৩ সালে জেব-উন-নিসার কবিতার দুটি ছোট খণ্ড ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে একটি ছিল মাগান লাল এবং জেসি ডানকান ওয়েস্টব্রুক এর অনুবাদে ‘উইজডম অফ দ্য ইস্ট’ সিরিজের অর্ন্তভূক্ত।
ভূমিকায়, ওয়েস্টব্রুক দিওয়ান-ই মাখফি সম্পর্কে বলেন, ১৭২৪ সালে, মাখফির মৃত্যুর ৩৫ বছর পরে, তার বিক্ষিপ্ত লেখা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। বইয়ে ৪২১টি গজল এবং বেশ কয়েকটি রুবাই ছিল। ১৭৩০ সালে আরও কিছু গজল যুক্ত করা হয়।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইরানের একজন কাজার রাজপুত্র মাহমুদ মির্জা তার নকল-ই মজলিসে প্রথম উল্লেখ করেন যে তিনি জেব-উন-নিসার দিওয়ানের একটি কপি দেখেছিলেন যা ভারত থেকে কেউ ইরানে এনেছিলেন। বৃটিশ লাইবেরিতে তার লেখার ১৮ শতকের একটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে।
উনিশ শতকের শেষ দিকে, তার বেশ কয়েকটি সংক্ষিপ্ত জীবনী জনপ্রিয় হয়ে, যেখানে তাকে একজন শিক্ষিত, অবিবাহিত রোমান্টিক রাজকন্যা হিসেবে বর্ণনা দেয়া হয়। বলা হয়, উদারপন্থী ও শিয়া মতাবলম্বী চাচা দারাশিকোর পুত্র সুলেইমান শিকোর সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। কিন্তু কট্টর আওরঙ্গজেব তা হতে দেননি। সুফি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাইয়ের সাথে মিলে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন। জীবনের ৩০টি বছর কাটে তার আওরঙ্গজেবের কারাগারে। দিল্লীতে ১৭০২ সালে তিনি মারা যান।
১.
যদিও আমি লায়লার মতো, কিন্তু হৃদয় আমার মজনুর মতোই দুঃখে ভরা
ছুটে বেড়াই মরুভূমিতে, পায়ে তবু সুশীলতার শেকল বাঁধা।
আমি এক রাজার কন্যা, কিন্তু দারিদ্রতার সাথেই আমার বসবাস
প্রত্যাখান করেছি সব অলঙ্কার, তবু আমার নাম জগতে নারীর অলঙ্কার।
২.
তোমার তরেই প্রথমে,
যার করুণার মেঘ থেকে
ফুটে ওঠে গোলাপ
আমার বাগানে!
তোমার প্রেমের প্রশংসায় তাই
শুরু করি আমার পদাবলী।
তৃষ্ণার্ত
যে ভালোবাসার জন্য আমার দেহ ও আত্মা;
মনসুরের মতোই যেন মাটির দানা
আমার এ শরীর, সে কেঁদে কয়—
তুমিই সমগ্র, আমি তার অংশ,
তাই আমি নিজেই ঈশ্বর।
তরঙ্গমালা
তোমার প্রেমের প্লাবন
ডুবিয়ে দেয় নশ্বরতার নৌকা,
আমার প্রেমাতুর আত্মা ডুবে গেছে এমন গভীরে
এমনকি নূহ নবীও তাকে তুলে আনতে পারেনি
যতক্ষণ না সে নিজে ভেসে ওঠে।
৩.
যেন ক্রীতদাস
অন্ধকারের শক্তি অনুগত বয়ে যাবে আমার জন্য;
যদি আমার প্রশংসার একটি বাণী গ্রহণ করে সে
মনে হয় যেন আমিই বাদশা সোলায়মান।
আর এখন
অশ্রু ঝরে না আর,
বিলাপ ঝরে না আমার জিহ্বা থেকে,
কেবল আমার হৃদয় থেকে মুক্তার মতো
রক্তবিন্দু চোখের পাতায় এসে দোলে।
সহ্য করো
ও মাখফি, ধৈর্যের সাথে এই যন্ত্রণা,
এ অন্তহীন।
আর ছেড়ে দাও বাসনার সেইসব রাত্রি
কারণ এরপরে, খিজির পাবে না খুঁজে
এমন আনন্দের ঝর্ণাধারা ।
৪.
ভালোবাসার পথ—কী অন্ধকার আর দীর্ঘ
এর আঁকাবাঁকা পথ, অনেক ফাঁদ একে ঘিরে!
তবুও উৎসুক তীর্থযাত্রীদের ভিড়
ঘুঘুর মতো পড়ে যাচ্ছে পাখির জালে।
বলো আমায়, কী শস্য বয়ে এনেছে সেই ঘুঘু?
কী সুন্দরই না ছিল সেই চিবুকের তিল।
ভালোবাসার জালটা বোনা হয়েছিল বলো কিসে?
প্রেমিকের অবিন্যস্ত কোঁকড়া চুলে।
ভালোবাসার উৎসব এখানে আটকে আছে,
পানপাত্র সরে যায়; পান করো এই মদ,
হ্যাঁ, জলে ঢেলে দাও, আর কখনও ভয় করো না–
এ নেশা সমস্তই ঐশ্বরিক ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং অভিযোগ করা কতোই না সহজ!
সমস্ত পৃথিবী কাঁদে তার দুঃখ উপশমে;
কিন্তু তোমার হৃদয়ে লুকিয়ে রাখো যে ব্যথা,
আর নীরবে পান করো যে দুঃখের বিষ, গর্ব তাতেই।
এখানেই আলোর উৎস, স্বর্গীয় ঝর্ণা
এখানে চিরন্তন করুণার দেখা;
তুমি মুসার চেয়েও উজ্জ্বল,
যখন সে পর্বত থেকে নেমে এসেছিল
তাঁর মুখে দীপ্ত ছিল ঈশ্বরের তেজ ।
দয়ায় তার সুখ্যাতি যেন আলিফ: শিরাজের কবি রাজকন্যা জাহান
শিরাজের নওরোজে আরও এক কবি ছিলেন। জাহান। ছিলেন পারস্য রাজকন্যা। পারিপার্শ্বিক কারণে সাধারণত রাজকন্যারা পরিচয় আড়ালে রেখে, এমনকি নারী-পরিচয় গোপনে রেখেই ছদ্মনামে লিখতেন। তবে জাহান ছিলেন ব্যতিক্রম। নিজের জাহান নামেই লিখতেন, পুরো নাম জাহান মালেক খাতুন।
চতুর্দশ শতকে পারস্যে হাফিজের জয়জয়কার। সেসময়ের কবিরা স্বাভাবিকভাবেই হাফিজে আচ্ছন্ন থাকতেন। জাহানেও সেই প্রভাব কম নয়। রাজকন্যা জাহানের সাহিত্য, সঙ্গীতের মজলিসে এমনকি হাফিজও থাকতেন। জাহানের কবিতা তুল্য হতো হাফিজ ও উবায়েদ যাকানির সাথে।
জাহান মূলত গজলই রচনা করতেন। তার দিওয়ান বা কাব্য সমগ্রের ভূমিকা থেকে বোঝা যায়, মৃত্যুর পর নিজের স্বাক্ষর রেখে যাবার তাড়না এবং দরবারি জীবনের অস্থিরতা মোকাবেলায় তিনি লিখতেন। জীবনকালে অন্তত চার শাসকের পতন দেখেছেন, বন্দিত্বও সয়েছেন।

জাহানের জন্ম তারিখ পাওয়া যায়নি। তবে ১৩২৪ সালে তার বাবা-মার বিয়ে হয়। সে সময়কালেই তার জন্ম হবার কথা। তার বাবা জালাল আল দীন মাসউদ শা ছিলেন শিরাজ ও ফার এর শাসক। মা ছিলেন গিয়াস আল দীন হামাদানির কন্যা। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব অপঘাতে বাবার মৃত্যুর পর চাচা শেখ জামাল আল দীন আবু ইসহাকের কাছেই বড় হন। শিল্প সমঝদার চাচা আবু ইসহাক দশ বছর শিরাজের শাসক ছিলেন। ছিলেন কবি হাফিজের পৃষ্ঠপোষক। জাহানকেও কবিতায় উৎসাহ দিতেন।
১৩৪৩ থেকে ১৩৪৭ সালের মধ্যে আমিন আল দীন জাহরুমির সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন জাহানের চাচা আবু ইসহাকের সহচর এবং ভাগ্নে। ১৩৫৩ সালে মোবারিজ আল দিন শিরাজ দখল করলে আবু ইসহাককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। জাহানের স্বামীও নিহত হন। জাহানের কবিতায় এসময়ের তার বন্দিত্ব ও নির্বাসিত জীবনের চিত্র পাওয়া যায়। মোবারিজ তার ছেলে শাহ শুজার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হলে জাহান শিরাজে ফিরে আসেন। এরপরের ৪০ বছরের তথ্য নেই। তবে আনুমানিক ১৩৯৩ সালে তিনি মারা যান।
এর প্রায় সাতশ বছর পর, নিস্তব্ধতার ঘুম ভেঙে ১৯৯৫ সালে ইরানে প্রথমবার তার রচনা প্রকাশিত হয়। প্রাক আধুনিক যুগের নারী কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দিওয়ানটি জাহানেরই। তার দিওয়ানে চারটি কাসিদা বা প্রশস্তিমূলক কবিতা, একটি স্তবক কবিতা, একটি দীর্ঘ মার্সিয়া বা শোকগাথা, ১২টি খণ্ডকবিতা, ৩৫৭টি রুবাই ও ১৪১৩টি গজল রয়েছে।
ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার, তুরস্কের তোপকাপি প্রাসাদ এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে তার চারটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। ২০১২ ও পরে ২০১৯ সালে পুরস্কারজয়ী ফার্সি অনুবাদক ও কবি ডিক ডেভিস তার কবিতার উল্লেখযোগ্য অংশ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। এরপর পশ্চিমা বিশ্বেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
তুমি জিজ্ঞেস করেছ কেমন আছি।
তোমাকে ছাড়া কেমনই বা থাকা যায়?
যদি ছেড়ে যেতে চাও, যাও আমার হৃদয় ছিন্ন করে
ঝরে যেতে দাও তোমার চোখের অশ্রুবিন্দু হয়ে।
তোমার ভ্রু ভংগিমায় এ হৃদয় উজার হোক
আটকে পড়তে দাও তোমার চোখের মায়ায়।
তোমার ফেলে যাওয়া পথে ঘুরপাক খাই
হতাশায় বিচ্ছিন্ন আমার হৃদয় ফেরত চাই।
তুমি ছাড়া যে মুহুর্ত কাটে, তাতে জীবন নেই
প্রতি পলক কেটে যায় শুধু অনুপস্থিতির শোকেই।
তার চুল হৃদয়ে জাগায় উত্তেজনা
রক্তরাঙা ঠোঁটের চুমু শান্ত করে উন্মাদনা।
দয়ায় তার সুখ্যাতি যেন আলিফ, চির সমুন্নত
তবু তার না থাকা আমাকে বাঁকিয়ে দেয় নুনের মতো।









