ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য সহসা কমছে না। বৈশ্বিক সঙ্কটের পাশাপাশি টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মিড লেভেলের এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভুগছে মূলধন সঙ্কটে। যেকারণে ২২ এলপিজি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৭ থেকে ৮টি কোম্পানি ভোক্তাপর্যায়ে সরবরাহে আছে। বাকীগুলোর হাতে সরবরাহ করার মতো এলপিজি নাই।
এলপিজি আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে, তারপরও সঙ্কট কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে কয়েকটি এলপিজি কোম্পানির দায়িত্বশীলদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেছেন, হঠাৎ টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় মূলধন হারিয়েছে মিডলেভেলের অধিকাংশ কোম্পানি।
কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে: ৭ থেকে ৮ মাস আগে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় মূল্য ছিলো ৮৬ টাকা। সেসময় সময় ব্যাংক থেকে কোম্পানি গুলো ঋণপত্র খুলে এলপিজি আমদানির পর প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিক্রি করে। কিন্তু ৬ থেকে ৭ মাসপর যখন ঋণপত্রের বিপরীতে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, তখন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় মূল্য ১০৬ থেকে ১১১-১১২ টাকা পর্যন্ত হয়ে যায়। যার কারণে যেসকল কোম্পানিগুলোর মূলধন ছিলো ৫০০ কোটি টাকা, ঋণপত্রের টাকা কেটে নেওয়ার পর দেখা যায় লাভ তো দূরে থাক সেটা গিয়ে ঠেকেছে ৪০০ কোটিতে। এখন মিডলেভেলের অধিকাংশ কোম্পানির হাতে নতুন করে এলপিজি নিয়ে আসার মতো টাকা নাই।
গত ৬ থেকে ৭ মাসে দীর্ঘ মেয়াদের এই ঋণপত্রে এলপিজি গ্যাস কোম্পানিগুলো ২৩ থেকে ২৫ শতাংশ মূলধন হারিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে। এলপিজি লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় সুযোগ পেলে অল্প সময়ে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে দাবি তাদের।
এ প্রসঙ্গে জি-গ্যাসের (এনার্জিপ্যাক পণ্য) চিফ বিজনেস অফিসার আবু সাঈদ রাজা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এলপিজি গ্যাসের বাজারে যে সঙ্কট তার পেছনে সাধারণ যে কারণের কথা বলা যায়, সেটা হলো বৈশ্বিক সঙ্কট। এরপর যেটা সেটা হলো এলসি ওপেন এবং আমদানি। সাধারণত এলপিজির একটি শিপমেন্ট আনার জন্য ১৮ থেকে ২২ লাখ ডলারের প্রয়োজন হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি সিঙ্গেল কোন ব্যাংক দিতে পারছে না। এরজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধায়নে দুইটা থেকে তিনটা ব্যাংকের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন। এলপিজি আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সেটি ব্যাংকগুলোর ডলার সরবরাহ সক্ষমতায় সময় সাপেক্ষ। আবার বাংলাদেশে যারা এলপিজি গ্যাসের ব্যবসায় আছে তাদের মধ্যে জায়ান্ট কোম্পানিগুলো তারল্য সঙ্কটে না থাকলেও হুট করে ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মিডলেভেলের কোম্পানিগুলো তারল্য সঙ্কটে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি পলিসিগত পরিবর্তন না আনে তাহলে মিডলেভেলের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যাংকগুলো আরো নমনীয় হলে এবং এলসি জটিলতা কমিয়ে আনলে অপারেটররা কম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও মন্তব্য তার।
তারল্য সঙ্কটের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায়- ঋণপত্র পরিশোধে বড় ধাক্কা গেছে কোম্পানিগুলোর ওপর দিয়ে। যেসকল জায়ান্ট কোম্পানি মূল ব্যবসার পাশাপাশি এলপিজি’র ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা সঙ্কট সামাল দিতে পেরেছে অন্য ব্যবসা থেকে ফান্ড এনে। কিন্তু যারা আমাদের মতো শুধু এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাদের জন্য এ ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কষ্টকর হচ্ছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে লাফস, টোটাল, পেট্রোম্যাক্স এবং আই গ্যাসের মতো কয়েকটি কোম্পানির মালিকানায় পরিবর্তন এসেছে। যার অধিকাংশ গেছে বিদেশিদের হাতে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন না হলে মিডলেভেলের কোম্পানিগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে অস্থিরতা কাটবে না এলপিজি গ্যাসের বাজারে।
২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার এলপিজি গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিইআরসি। সেখানে সাড়ে পাঁচ কেজির সিলিন্ডার ৬৮৭ টাকা, ১২ কেজির এলপিজির দাম এক হাজার ৪৯৮ ও ১৫ কেজির এলপিজির দাম এক হাজার ৮৭৩ টাকা। ১৬ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৯৯৮ টাকা, ১৮ কেজির দাম দুই ২৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়া, ২০ কেজি এলপিজি দুই হাজার ৪৯৭, ২২ কেজির দাম দুই হাজার ৭৪৭, ২৫ কেজির দাম তিন হাজার ১২১, ৩০ কেজির দাম তিন হাজার ৭৪৫, ৩৩ কেজির দাম চার হাজার ১২৪, ৩৫ কেজির সিলিন্ডার চার হাজার ৩৭০ ও ৪৫ কেজির দাম পাঁচ হাজার ৬১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু ১২ কোজির সিলিন্ডারই খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮৫০ টাকা পর্যন্ত।
দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের মতো, যার ৯৮ শতাংশই আমদানি নির্ভর। আর সারাদেশে ৫০ লাখ বসতবাড়িতে এলপিজি গ্যাসের গ্রাহক রয়েছে।









