দেশের আদালতে কেউ যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান, তবে তিনি একটা দীর্ঘমেয়াদে কারাবাসে থাকেন। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত বিশেষ করে যারা বয়স্ক ও নারী কারাবন্দি রয়েছেন, তাদের সাজার মেয়াদ কমানো হবে। নারীদের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবনের মেয়াদ কমিয়ে ২০ বছর করা হবে। পুরুষের ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ এর চেয়ে কিছুটা বাড়তে পারে। তবে মেয়াদ কত করা হবে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
বাংলাদেশের আইনে যাবজ্জীবন বলতে ৩০ বছর কারাদণ্ড বুঝায়। তবে ২০১৭ সালেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। সেসময় সাভারের একজন ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আপিল বিভাগ বলেছিল, যাবজ্জীবন মানে ত্রিশ বছর নয়, আমৃত্যু কারাবাস। এ ঘটনায় তখন তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়েছিল।

আপিল বিভাগের বলা এই মেয়াদ নিয়ে তখন আইনজীবীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে একটি রিভিউ আবেদন হলে চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগ বলেছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া ১৮৬০ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী দেশে কোনো আসামির যাজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর জেল। সেই কারাদণ্ড কমিয়ে এখন নারীদের জন্য ২০ বছর এবং পুরুষদের জন্য ২০ বছরের কিছুটা বেশি করার চিন্তা করছে সরকার, এমনটাই জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
অন্যদিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড হচ্ছে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতদিন বাঁচবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কারাবাস। এক্ষেত্রে মৃত্যুর আগে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাভাবিকভাবে মুক্তি পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন আমীর গোলাম আজমকে ৯০ বছর বয়সে ৯১ বছরের সাজা দিয়েছিলেন আদালত। সেটিকেও একপ্রকার আমৃত্যু কারাদণ্ড বলেই বিবেচনা করা হয়।
এছাড়া ২০১৪ সালে যাবজ্জীবন আর আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। সেসময় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের রায়ে একই বিতর্ক হয়। পরে ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কাশিমপুর কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড বলে জানিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তখনও বিতর্ক হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ বলেছে, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু নয়, ৩০ বছর কারাদণ্ড।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ সার্বিকভাবে কমালে দেশে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, কারাগারে বছর হয় ৯ মাসে। সেই হিসাবে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সাড়ে ২২ বছর জেলে থাকেন। যাবজ্জীবনের মেয়াদ ২০ বছর হলে এটা ১৫ বছরে নেমে আসবে। এরমধ্যে বিচারের সময় কেউ ৭-৮ বছর গ্রেপ্তার থাকলে সেটিও বাদ যাবে। সার্বিকভাবে এমন সিদ্ধান্তে অপরাধের প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় এটি করা হলে ঠিক আছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও তার বক্তব্যে সাজার মেয়াদ কমানোর ক্ষেত্রে অপরাধীর বয়সসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হবে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কতগুলো স্পেসিফিক আছে, তার বয়সটা কত। যে ১৮ বছরে অপকর্ম করেছে, ২০ বছর পর তাকে ছেড়ে দিলে তখন তো তার বয়স ৩৮ বছর হয়। সে হয়তো এসে আবার অপকর্ম করতে পারে। এ বিষয়গুলো দেখা হবে। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে আমরা একটু বেশি লিবারেল। আবার কারাগারে অনেক সমস্যা আছে, এটা সংস্কারেরও দরকার। কারাগারের বাজেটের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে যাদের অনেক বয়স হয়ে গেছে, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, তাদের ওষুধের জন্য আরও বাজেট দরকার হয়।









