ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা ছিনিয়ে নিচ্ছে গরিব মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলায় অবস্থিত বৈগুনি গ্রামের প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ কিডনি বিক্রি করেছেন। এ কারণে এই এলাকাটিকে স্থানীয়ভাবে “এক কিডনির গ্রাম” বলা হয়।
শুক্রবার (৪ জুলাই) আল জাজিরায় কিডনি পাচার বিষয়ক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইনি ফাঁকফোকর ও জালিয়াতির মাধ্যমে দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশিদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ভারতীয়দের কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের চাহিদা পূরণে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে এক দালালচক্র। ভারতে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ রোগী কিডনি ফেইলিওরে ভোগেন, কিন্তু ট্রান্সপ্লান্ট হয় মাত্র ১৩,৬০০ জনের। এই ঘাটতি পূরণে অবৈধ পথে কিডনির এই চোরা চালান সংগঠিত হয়।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল গ্লোবাল হেলথ এ প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণা বলছে, কালাই উপজেলার প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন কিডনি বিক্রি করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কালাই উপজেলার বৈগুনি গ্রামে সবচেয়ে বেশি কিডনি বিক্রি করেন ৩০-৩৫ বছর বয়সী পুরুষরা। ৮৩ শতাংশ বিক্রেতা বলেছেন, দারিদ্র্যতা তাদের প্রধান কারণ। তবে কেউ কেউ ঋণ শোধ, মাদকাসক্তি অথবা জুয়ার কারণেও কিডনি বিক্রি করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে, কালাই উপজেলার বৈগুনি গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী কিডনি হারানো সফিরউদ্দিনের পূর্নাজ্ঞ অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ভারতে ৩.৫ লাখ টাকার বিনিময়ে কিডনি বিক্রি করেছিলেন, ভেবেছিলেন এই অর্থে তার তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু সেই অর্থ অনেক আগেই শেষ, বাড়িটি এখনও অসমাপ্ত। সফিরউদ্দীন বলেন, আমি কিডনি বিক্রি করেছি আমার পরিবার এবং স্ত্রী-সন্তানদের ভালো রাখতে।
তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য ও হতাশা তাকে দালালদের প্রস্তাবে রাজি করায়। তারা ভিসা, ফ্লাইট, ভুয়া কাগজপত্র ও হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ভারতে নিয়ে যায়। তিনি জানেন না, তার কিডনি কার শরীরে গেছে।
কালাই উপজেলার সফিরউদ্দিনের মত ৪৫ বছর বয়সী জোসনা বেগম এবং তার স্বামী বেলাল হোসেনের গল্প একই রকম। স্বল্পমুল্যে কিডনি বিক্রি এবং কিডনি অপারেশনের পর আর কোনো ধরনের ওষুধ বা চিকিৎসা পাননি তারা। জোসনা বেগম বলেন, আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে, এখন ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা ও ওষুধের টানাপোড়েনে ভুগছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে এই চক্রে ডাক্তার থেকে শুরু করে ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের পাচারকারী জড়িত।
কিডনি পাচারকারী এক দালালের ভাষ্যমতে, কিডনির জন্য গ্রাহকরা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত পরিশোধ করে। কিন্তু যাঁরা কিডনি দান করেন, তারা এর খুবই সামান্য অংশ পান। দাতারা সাধারণত ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পান।
ভারতের আইন অনুযায়ী, কিডনি দান শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বা বিশেষ সরকারি অনুমতিতে করা যায়। সেই কারনেই সফিরউদ্দীনকেও কিডনি প্রাপকের আত্মীয় দেখিয়ে জাল সনদ করা হয়। এই আইনের কারনে পাচারকারীরা ভুয়া পরিবারিক সম্পর্ক, হাসপাতালের কাগজপত্র এমনকি জাল ডিএনএ রিপোর্ট তৈরি করে এই আইন এড়িয়ে যায়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ভারতের কোনো ধনী রোগীর কিডনি দরকার হলে, একজন মধ্যস্বত্বভোগী একজন গরিব বাংলাদেশিকে খুঁজে বের করে যাদের চাকরির লোভ দেখিয়ে নিয়ে যায়। এই চক্র এভাবেই ঘুরে চলে।
কিডনি ওয়ারিয়র্স ফাউন্ডেশনের প্রধান বসুন্ধরা রঘুবংশ বলেন, যদি এই বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা না যায়, তাহলে ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সার্জারির পর চিকিৎসা সহায়তা এবং আর্থিক সুরক্ষাসহ একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।









