প্রথমেই পরিস্কার করে নেয়া ভালো যে, আমি নিজে নাট্য জগতের কেউ নই। আমার একাডেমিক পড়াশোনা চলচ্চিত্রকলা নিয়েই। তারপরও, অন্যান্য দৃশ্য-শব্দ-কল্পমাধ্যমের প্রতি আমার রয়েছে অসীম আগ্রহ ও বোঝবার চেষ্টা।
প্রাচ্যনাট নাট্যদলের প্রযোজনায় নাটক– “খোয়াবনামা” প্রদর্শিত হচ্ছে। এটি এই দলের ৩৭তম প্রযোজনা। ফলে নতুন নাটকের দল এটি নয়। সঙ্গত কারণেই তাই ওঁদের নাটকের প্রতি একটা আলাদা উৎসাহ, উদ্দীপনা দর্শকদের মধ্যে বিরাজমান। এইক্ষেত্রেও তার ব্যত্বয় ঘটেনি।
প্রথমে, উপন্যাসটার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা আলাপ সেরে নেয়া যাক। উপন্যাসটি একেবারেই সরলরৈখিক আখ্যান রচনরীতির নয় এবং তা সচকিত পাঠক মাত্রই অনুমান করে নিতে পারে যখন উপন্যাসের রচয়িতার স্থানে “আখতারুজ্জামান ইলিয়াস” নামটি জ্বল-জ্বল করে জ্বলে থাকে। উপন্যাসের ঘটমানতার স্থান সীমিত হলেও (বগুড়া অঞ্চলের উল্লেখে) সময়কাল অথবা ব্যাপ্তী কিংবা বিস্তার একেবারে তেতাল্লিশের মন্বন্তর থেকে শুরু করে, দেশভাগ, তেভাগা আন্দোলন, তাতে কৃষক-চাষীদের অংশগ্রহন, জমিদারী বিলুপ্তি তারপর পাকিস্তান আন্দোলন হয়ে একেবারে নিকট অতীত ছুঁয়ে যায়। খেয়াল রাখা দরকার, আখ্যানটি রচনার কাল – ১৯৯৬।
পরাবাস্তববাদী উপন্যাসের গোড়াপত্তন বাংলায় যে ক’জন সৃষ্টিশীল লেখকের অবদান; তার মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহিদুল জহির, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রধানতম। পরের দু’জনের তুলনায় সংখ্যায় কম লিখলেও চিলেকোঠার সেপাই (উপন্যাস), খোয়াবনামা (উপন্যাস), দোজখের ওম, দুধভাতে উৎপাত, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোয়ারি, জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল (গল্পগ্রন্থ) এবং সংস্কৃতির ভাঙা সেতু নামে একটি প্রবন্ধ সংকলনগ্রন্থ। ক্ষণজন্মা এই লেখকের লেখা থেকে যেকোনো শিল্পভাষার অনুবাদই দুরহ। সেই দুরহ কাজটি সম্পাদন করেছে – “প্রাচ্যনাট”। শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন তাদের প্রতি, যারা এই দুঃসাধ্য কাজকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
নাটকের আলাপে বোধ করি, অলিখিত নিয়মের মতোন করেই চলে আসে মঞ্চসজ্জা, আলোকসম্পাত, সংগীতের ব্যবহার, কোরিওগ্রাফি, পোশাক ও প্রপ্স ভাবনা ইত্যাদি বিষয়াদি। ঠিক যেমন চলচ্চিত্রে ক্যামেরার ভাষা, চিত্রনাট্যের মেজাজ এবং সম্পাদনার রীতি! মঞ্চসজ্জা অর্থাৎ, মঞ্চব্যবহারে ফোরগ্রাউন্ড, মিডগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা রাইট-লেফট সেগমেন্ট ভাগ করে ঘটনাপ্রবাহ তুলে আনা হয়েছে। যেহেতু, উপন্যাসটি ৩৫০ পৃষ্ঠার এবং একটি বিশাল সময়কালকে ঘিরে, তাই নাট্যরূপে দেড় ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ের বেড়াজালে বন্দী করতে যে কুশলী পদ্ধতিতে মঞ্চকে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে তারিফের দাবিদার। দর্শকের মনো জগতের যোগ অর্থাৎ কিনা মনোযোগ নিশ্চিত করতে ফোকাসড লাইটের ব্যবহার মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। আঞ্চলিক ভাষার সাবলীল সংলাপের পরেই ঘণ্টাধ্বনি এবং পরিশীলিত ভাষায় বর্ণনরীতি নাটকটিকে সহজবোধ্য ও সুপাঠ্য করে তুলেছে। যেখানে, সময় বা কাল সংকোচন প্রয়োজন সেখানে সংগীত ব্যবহার কিংবা আলোক সম্পাতের সাহায্যে দিন-রাত্রি পার হয়ে যাওয়া অভূতপূর্ব, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিনেমাটিকও বটে! কোরিওগ্রাফির কথা চলেই আসে যখন সংগীতের সাথে সঙ্গত রেখে নাচ দেখানো হয়; মনে রাখা দরকার, মাধ্যমগত কারণে মঞ্চনাটক কিন্তু উচ্চকিত অভিনয় দাবি করে। ফলে এখানে, নাচের মাধ্যমে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছে, তা আখ্যানের মেজাজের সাথে একেবারেই মিশে যেতে পেরেছে। কিছুটা হাস্য-কৌতুক রাখা হয়েছে, যা নাটকটিকে প্রাণবন্ত করেছে, দর্শককে করেছে প্যাসিভ কনজিউমার থেকে অ্যাক্টিভ পারটিসিপেন্ট। পোশাক এবং প্রপ্স যে কোন আখ্যানের সময়কে বুঝবার অন্যতম সেরা উপাদান। নাটকে তো বটেই। যদি ত্রুটি থাকতো, তাহলে গল্প থেকে ছিটকে পরবার সুযোগ তৈরি হতো, কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। বরং লম্বা সময় ধরে ওঁদের সাথে থাকবার কারণে নিজেকেও নিজগিরিডাঙ্গার বাসিন্দা মনে হয়েছে, কদাচিৎ!
“সাহিত্যের মঞ্চভ্রমণ” বলে একটা শব্দবন্ধ প্রচলিত রয়েছে, নাটকের রিভিউ-এর ক্ষেত্রে। যদিও আমি ঠিক নিশ্চিত নই, এই শব্দবন্ধের অর্থ কী? চলচ্চিত্রকার আন্দ্রে তারকোভস্কি কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন – “কবিতা অনুবাদযোগ্য নয়, বরং অনুবাদে কবিতা তার মর্মার্থ হারায়।” ফলে সাহিত্যের কেবল মঞ্চনাটকের রুপে মঞ্চভ্রমণ সম্ভব এমন উক্তি কি সঠিক? সাহিত্যরস আর নাট্যরস কি এক বিষয়? তাহলে তো সাহিত্যাশ্রয়ী চলচ্চিত্র সাহিত্যের ক্যামেরা ভ্রমণ(!) কিন্তু আদতে বিষয়টা মোটেও তা নয়, তা হওয়া সম্ভবও নয়। প্রতিটি শিল্প প্রকাশভঙ্গি নিজের উপাদান যুক্ত-বিযুক্ত করে নিজ ভাষা প্রকাশভঙ্গিতে উপস্থাপন করে, অন্তত “খোয়াবনামা” উপন্যাস এবং নাটকটি সেই কথাই প্রকাশ করে। মঞ্চনাটকের জন্য খোয়াবনামা-র অনেক রদবদল, অনেক দৃশ্য সঙ্কোচন ও সন্নিবেশ করতে যেমন হয়েছে, তেমনি সহজে বোঝা যায় এমন ঘটমানতায় জোর প্রদান করে বিষয়কে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জহির রায়হানের “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসের শেষ লাইনে– “রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরনো সেই রাত” অনুকল্প ফিরে আসে এই নাটকের শেষেও। স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, ক্ষুধা, তৃষ্ণার মানুষই হয়ে ওঠে এই আখ্যানের মূলকথা। তমিজ, তমিলের বাপ, কুলসুম, ফুলজান, হুরমতুল্লাহ তাই এক একটি সেম্পল হিসেবে হাজির হয়ে গোটা সমাজকেই মূর্ততা প্রদান করে।
অশেষ ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা নাট্যরূপকারী এবং নাট্যনির্দেশনাকারী উভয়কে; এমন দুঃসাহসী একটি আখ্যান নিয়ে কাজ করবার জন্য। আমাদের বাড়ন্ত সাহিত্য পাঠে অনুৎসাহী প্রজন্মকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে পরিচয়ের সূচনা করিয়ে দেবার জন্য।
খোয়াবনামা
উপন্যাস রচয়িতা: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
নাট্যরূপ: মো. শওকত হোসেন সজিব
লেখক: শৈবাল সারোয়ার, চলচ্চিত্র সমালোচক ও নির্মাতা







