মুস্তাফা মনোয়ার। জীবন্ত কিংবদন্তি। চিত্রশিল্পে স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণা, বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক পাপেটের বিকাশ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও নাটকে অতুলনীয় কৃতিত্ব প্রদর্শন, শিল্পকলার উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) এই কিংবদন্তি শিল্পীর ৯০ বছর পূর্ণ করে ৯১ বছরে পদার্পণ করলেন। তার জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা পোস্ট করেন লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারূন। চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-
বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, চৌষট্টিতে ঢাকায় টেলিভিশনের দীপ্তযাত্রা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতির গৌরবময় অধ্যায়, সবকিছুতেই যার রয়েছে অনন্য অবদান, তিনি আমাদের অনেক কাছের একজন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি আমাদের স্বাধীনতা ও শিল্পকলাকে অন্তরে ধারণ করেছেন।
তাকে চিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই। বাংলাদেশ টেলিভিশন তখন ছিলো আমার কাছে একটি স্বপ্ন তৈরির কারখানা, যেখানে কাজ করেন মুস্তাফা মনোয়ারের মতো সৃজনশীল মানুষ। তখনো ভাবিনি, এই স্বপ্ন তৈরির কারখানায় একদিন আমিও হবো একজন কারিগর।
১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, তারপর ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’য় অধ্যয়ন। ছাত্রজীবনে কর্মজীবন নিয়ে ছিলাম অনেকটা উদাসীন। বন্ধুরা যখন বিসিএস-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমি তখন থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য দেশের বাইরে চলে যাই। ফিরে এসে কী করবো জানতাম না। একদিন দেখা করলাম মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সেন্ট্রাল রোডের বাসায়। তিনি তখন বাংলাদেশ পারফর্মিং আর্টস একাডেমির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর আগ্রহে ঐ প্রতিষ্ঠানের নাট্য প্রশিক্ষক হিসেবে আমি ও জামিল আহমেদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক) যোগদান করি ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিটিভির চারজন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের তালিকায় সেসময়ের বিটিভির মহাপরিচালক জামিল চৌধুরী এবং জেনারেল ম্যানেজার মুস্তাফা মনোয়ারও ছিলেন। কিন্তু আগেই খবর পেয়ে যাওয়ায় তাঁরা সেদিন রামপুরা টিভি ভবনে আসেননি। কিছুদিন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পর একসময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আগ্রহে তাঁরা আবার কাজে ফিরে আসেন। কিন্তু দুজনের কেউই আর বিটিভিতে ফিরতে রাজি ছিলেন না। রাষ্ট্রপতি জিয়া গুণী মানুষদের খুঁজে বের করতেন। তিনি জামিল চৌধুরীর মাধ্যমে জাতীয় সম্প্রচার একাডেমি (পরবর্তীতে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট) এবং মুস্তাফা মনোয়ারের উদ্যোগে বাংলাদেশ পারফরমিং আর্টস একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। পারফরমিং আর্টস একাডেমি পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত হয়ে যায় এবং তিনি একসময় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
অনেকেই জানেন বিটিভির অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-র কথা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় চালু করা হয় ‘নতুন কুঁড়ি’। বিটিভির বাইরে থাকলেও এই সিরিজটির মূল পরিকল্পনায় ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। জিয়াউর রহমানের বিটিভি নিয়ে অনেক পরিকল্পনা ছিলো। তাঁর সময়েই আমরা একদল তরুণ ১৯৮০ সালে বিটিভিতে প্রযোজক পদে যোগদান করি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করি, সে সময়ে জিয়ার উদ্যোগেই চালু হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এওয়ার্ড, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদক। যদিও পরবর্তীতে এরশাদের সময় টেলিভিশন এওয়ার্ড বিলুপ্ত করা হয়েছিলো।
মুস্তাফা মনোয়ার বিটিভির বাইরে থাকলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’। নাটকটি ১৯৭৭ সালে শুরু হলেও নির্মাণ শেষ হয় ১৯৭৯ সালের শেষে। আমি তখন পারফর্মিং আর্টস একাডেমির সাথে যুক্ত থাকায় সম্পাদনার কাজ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে ‘রক্তকরবী’ প্রথম সম্প্রচারিত হলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নাট্য ও টেলিভিশন অঙ্গনে এক প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রক্তকরবী’র উপর আমার একটা লেখা সে সময়ে প্রকাশিত হয়েছিলো ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকায়।
নাট্যজগতের মহাপুরুষ শম্ভু মিত্র ও বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় মন্তব্য করেছিলেন—টেলিভিশনে এত বড় মাপের একটি নাটক এত অসাধারণভাবে নির্মাণ করা সম্ভব, তা তাঁদের জানা ছিল না। আমি তাই ‘রক্তকরবী’কে শুধু একটি টিভি নাটক না বলে, টেলিভিশন মাধ্যমে নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ থিয়েটার বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
‘রক্তকরবী’র বিশাল সেট, ত্রিমাত্রিক লাইটিং, কস্টিউম, মেকআপ—সবকিছুতেই ছিল নাটকীয় বৈচিত্র্য। অভিনয়ে দিলশাদ খানম, গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, আফজাল হোসেন, সাইদুল আনাম টুটুলসহ সকলে যে দিন-রাত শ্রম দিয়েছিলেন, তা অতুলনীয়। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শিল্পের যাদুকর— অভিনেতাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা কীভাবে আদায় করতে হয় তা তিনি জানতেন।
কলকাতায়ও তিনি যথেষ্ট সুপরিচিত ছিলেন। প্রথমে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে, পরে ভর্তি হন সরকারি আর্ট কলেজে। ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দেশে ফিরে আসেন, শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকা আর্ট কলেজে। আর ১৯৬৪ সালে ঢাকায় টেলিভিশন চালু হলে প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং টেলিভিশনকে এক সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি আমদের দেশে পাপেট থিয়েটারকে জনপ্রিয় করেন। পাপেট তৈরি করা থেকে শুরু করে, পান্ডুলিপি তৈরি, শিল্পী নির্বাচন, সঙ্গীত প্রয়োগ থেকে পরিবেশনা পর্যন্ত সবকিছুই তিনি নিজের মতো করেই করতেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশজুড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মধ্যে আশা ও মনোবল জাগিয়ে তোলার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিলো। মুস্তাফা মনোয়ার সেই সময় ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে পুতুলনাট্য পরিচালনা করেছিলেন। এই পাপেট শোগুলোতে তিনি সহজ ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য, স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এবং পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার কথা তুলে ধরতেন। পুতুলনাট্যের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে শিশু ও সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারতো মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য। এতে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার সাহস পেতো, তেমনি শরণার্থীদের ভেতরে হতাশা ও ভয়ের পরিবর্তে আশা ও উদ্দীপনা তৈরি হতো। মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন পুতুলনাট্য শুধু বিনোদন নয়, এটি এক ধরনের গণআন্দোলনের ভাষা। তাঁর সেই প্রয়াস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রজতজয়ন্তী পালিত হয়। সে সময় মুস্তাফা মনোয়ার কিছুদিনের জন্য বিটিভিতে ফিরে আসেন উপ-মহাপরিচালক হিসেবে। ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা তিনিই করেছিলেন। অনুষ্ঠানে পাকিস্তান, ভারত, ব্রিটেন থেকে বহুজন অংশ নেন। মনে আছে, পাকিস্তান টেলিভিশনের মহাপরিচালক জামান আলী খানও এসেছিলেন। তিনি বাঙালি হলেও একাত্তরের পর পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী আজমেরী জামান রেশমা ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, যিনি কিন্তু পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন এবং আর ফিরে যাননি।
২০১৪ সালে বিটিভির সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার ও জামিল চৌধুরী। ১৯৭৫-এর পর সেই প্রথমবার জামিল চৌধুরী রামপুরা টিভি ভবনে আসেন। দীর্ঘ দিনের অভিমান ভুলে। ৫০ বছর পূর্তির সেই অনুষ্ঠানে দেশ–বিদেশের বহুজনের সম্মিলন ঘটে বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রে। কলকাতা থেকে আসেন টেলিভিশনের প্রথম অনুষ্ঠান ঘোষক মর্ডি কোহেন। তাঁর সুদর্শন চেহারা ও ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। তবে তিনি কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
এদেশে টেলিভিশনের দুই প্রতিষ্ঠাতা কিংবদন্তি জামিল চৌধুরী ও মুস্তাফা মনোয়ার এখনো আমাদের মাঝে আছেন। জামিল চৌধুরী ৯২ বছর বয়সে আছেন টরন্টোর এক আধুনিক ওল্ডহোমে। আর মুস্তাফা মনোয়ার আছেন ঢাকাতেই নিজ বাসভবনে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তিনি ৯১ বছরে পদার্পণ করলেন।









