জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করেছে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের চারটি প্যানেল। দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ওই চার প্যানেলের প্রার্থীরা।
ভোট কারচুপির অভিযোগে বিকেলের দিকে ভোট বর্জন করে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ও বামপন্থীদের একটি প্যানেল ‘সংশপ্তক’।
সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। ক্যাম্পাস জুড়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে চারটি প্যানেলের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেন শরণ এহসান। এতে সংহতি জানায় ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল, ছাত্র ইউনিয়ন (ইমন-তানজিম) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ‘সংশপ্তক পর্ষদ’, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) প্যানেল।
লিখিত বক্তব্যে ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী শরণ এহসান বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা, অব্যবস্থাপনা ও অথর্বতা এই সমগ্র নির্বাচনের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছি এই নির্বাচনকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ অসহযোগিতা, পক্ষপাতদুষ্টতা ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার চূড়ান্ত অনিচ্ছা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পোলিং এজেন্টদের কাজ করতে না দেওয়া, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা, ভোটারের তুলনায় ব্যালট বেশি ছাপানো, লাইন জ্যামিং, বহিরাগতদের আনাগোনা ইত্যাদি অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই দায় কেবল এবং কেবলমাত্র এই ব্যর্থ, অথর্ব এবং পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসনের। এই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াতেই নির্বাচনের ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় জাকসু নির্বাচন আমাদের আজীবনের দাবি। আমরা এই অনিয়মের নির্বাচনকে বয়কট করেছি এবং দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনঃনির্বাচনের দাবী জানাচ্ছি।
লিখিত বক্তব্যে পুরো দিনের নির্বাচনের অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে বলেন, প্রথমত, নির্বাচনের প্রথম দুই ঘণ্টায় কোনো পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। উল্লেখ্য যে, গতকাল রাত দুইটায় নির্বাচনের ঠিক পাঁচ ঘণ্টা আগে প্রবেশের ব্যাপার নিশ্চিত করা হয়। তবুও আজ সকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে, প্রার্থীদের স্বাক্ষর, পোলিং এজেন্টদের ছবি ইত্যাদি নতুন নতুন বাহানা এনে তাদেরকে অন্তত দুই ঘণ্টা পর প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট নিশ্চিতকারী আঙুলের কালি সকাল থেকে দেয়া হয়নি। অভিযোগ তুললে কালি নিয়ে আসা হলেও দেখা যায় সে কালি কিছুক্ষণের মাঝে হাত থেকে উঠে যায়।
তৃতীয়ত, নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে (বিশেষত ছাত্রী হলে) দেখা গেছে একটি নির্দিষ্ট প্যানেলে (ছাত্রশিবির) লিফলেট হাতে হাতে সরবরাহ করছিল, এমনকি জাহানারা ইমাম হলে বুথের মাঝে দুটি প্যানেলের (জিতু+শিবির) লিফলেট সাজিয়ে রাখতে দেখা যায়। এটি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত করে। এমনকি জাহানারা ইমাম হলে মেয়েদের মারধরের অভিযোগ পাওয়া যায়।
চতুর্থত, ১০% বেশি ব্যালট পেপার ছাপিয়ে এই প্রশাসন প্রহসন করেছে, এমনকি আজ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হয় ও বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পঞ্চমত, নজরুল হলে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে সব প্রার্থীর নাম না থাকায় সেখানে প্রথমে বাকি প্রার্থীদের নাম ছাড়াই নির্বাচন চলতে থাকে এবং পরবর্তীতে হাতে লিখে প্রার্থীদের নাম ব্যালট পেপারে যোগ করা হয়।
ষষ্ঠত, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা, ভোটারের তুলনায় ব্যালট বেশি ছাপানো, লাইন জ্যামিং, বহিরাগতদের আনাগোনা ইত্যাদি অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির কারণে এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্নে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ৭৪৩। এর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৭২৮ এবং ছাত্র ৬ হাজার ১৫ জন। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৭৭ জন প্রার্থী। ভিপি পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ৮ জন, যুগ্ম সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন এবং যুগ্ম সম্পাদক (পুরুষ) পদে লড়ছেন ১০ জন প্রার্থী। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে হল সংসদ নির্বাচনও।
প্রতিটি হলে থাকছে ভোটকেন্দ্র—যার মধ্যে ১১টি ছাত্রদের জন্য এবং ১০টি ছাত্রীদের জন্য। ২২৪টি বুথে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন ১৩৪ জন পোলিং অফিসার ও সহকারী। নির্বাচনী কমিশন জানিয়েছে, সব ভোটকেন্দ্র মনিটরিং রুম থেকে নজরদারিতে থাকবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে, সে জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।









