জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সিনেট ভবনে ভোট গণনা চলছে। জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। রাত সোয়া ৯টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্বাচন বর্জনের পর বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রদল।
ভোট গ্রহণ শেষে হলগুলো থেকে ব্যালট বাক্স কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সিনেট ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোট গণনা শুরুর কথা থাকলেও রাত সোয়া ১০টায় গণনা শুরু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. খো. লুৎফুল এলাহী বলেন যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি ম্যানুয়াল করতে হবে, সেহেতু একটু দেরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সকালও হতে পারে।

এরআগে নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক রশিদুল আলম সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হবে। তাই ফলাফল পেতে আগামীকাল সকাল বা দুপুর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি হলের ব্যালট পৃথকভাবে গণনা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিনেট, হলসহ ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। দ্রুত প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে।

অনানুষ্ঠানিক তথ্য বলছে, ছেলেদের হলগুলোর মধ্যে আল বেরুনী হলে ২১১ ভোটের বিপরীতে ১২৫টি, আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলে ৩৪১ ভোটের বিপরীতে ২১৬টি, মীর মশাররফ হোসেন হলে ৪৬৪ ভোটের বিপরীতে ৩১০টি, শহিদ সালাম-বরকত হলে ২৯৯ ভোটের বিপরীতে ২২৪টি, মাওলানা ভাসানী হলে ৫১৪ ভোটের বিপরীতে ৩৮৪টি, ১০ নম্বর (ছাত্র) হলে ৫৪১ ভোটের বিপরীতে ৩৮১টি, শহিদ রফিক-জব্বার হলে ৬৫৬ ভোটের বিপরীতে ৪৭০টি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৩৫০ ভোটের বিপরীতে ২৬১টি, ২১ নম্বর (ছাত্র) হলে ৭৩৫ ভোটের বিপরীতে ৫৬৪টি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে ৯৯১ ভোটের বিপরীতে ৮১০টি এবং শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে ৯৪৭ ভোটের বিপরীতে ৭৫২টি ভোট পড়েছে।
মেয়েদের হলগুলোর মধ্যে জাহানারা ইমাম হলে ৩৬৭ ভোটের বিপরীতে ২৪৭টি, প্রীতিলতা হলে ৩৯৯ ভোটের বিপরীতে ২৪৬টি, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৪০৯ ভোটের বিপরীতে ২৪৯টি, নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ২৮০ ভোটের বিপরীতে ১৩৭টি, বেগম সুফিয়া কামাল হলে ৪৫৬ ভোটের বিপরীতে ২৪৬টি, ১৩ নম্বর (ছাত্রী) হলে ৫৩২ ভোটের বিপরীতে ২৭৯টি, ১৫ নম্বর (ছাত্রী) হলে ৫৭১ ভোটের বিপরীতে ৩৩৮টি, রোকেয়া হলে ৯৫৫ ভোটের বিপরীতে ৬৮০টি, ফজিলাতুন্নেছা হলে ৮০৩ ভোটের বিপরীতে ৪৮৯টি, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলে ৯৮৪ ভোটের বিপরীতে ৫৯৫টি ভোট পড়েছে।
২১ হলে ভোটগ্রহণ শেষে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের জানান, জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন।
এদিকে জাকসু ভোট বর্জনের পর রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
রাত সোয়া ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন রেজিস্ট্রি ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে নেতৃত্ব দেন জাকসুতে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী শেখ সাদি হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, যুগ্ম আহ্বায়ক মো, আফফান আলী।

পরে সংক্ষিপ্ত এক সামবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, “৫ অগাস্টের পর ছাত্রদল ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে ধারণ করে রাজনীতি করছে। আমরা শুরু থেকেই জাকসু ভোটের পক্ষে দৃঢ় অবস্থা নিয়ে রাজনীতি করেছি। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের প্রত্যাশা তৈরি হয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, ভোটগ্রহণের ব্যালট ও ওএমআর মেশিন জামায়াত ইসলামীর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি জানার পর ছাত্রদল প্রশাসনকে অবহিত করে এবং চাপের মুখে পড়ে ব্যালট পেপার হাতে গোনার সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি দাবি করেন, “১২ হাজার ভোটারের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন ১৫ হাজার ব্যালট ছাপিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা আশঙ্কা করছি, নির্বাচন কমিশন এসব অতিরিক্ত ব্যালট ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। এবং সেগুলো ব্যবহার করে তারা ভোট দিয়েছে।”
রাতে জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করেছে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের চারটি প্যানেল। দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ওই চার প্যানেলের প্রার্থীরা। ভোট কারচুপির অভিযোগে বিকেলের দিকে ভোট বর্জন করে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ও বামপন্থীদের একটি প্যানেল ‘সংশপ্তক’।
প্রায় ৩৩ বছর পর হওয়া জাকসু নির্বাচনের দিনটি কাটলো প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে। ভোট গ্রহণ শুরুর ৬ ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলন করে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদলের প্যানেল। আর পোলিং এজেন্টেসহ কয়েকটি বিষয়ে অসঙ্গতি পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশিবিরের প্যানেল।
সমন্বিতভাবে ওঠা বাকি অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে নির্বাচন কমিশনের প্রতি ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) প্যানেলের অনাস্থা। তাদের অভিযোগ, এই নির্বাচন যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হচ্ছে না। এই অনিয়ম শুরু হয়েছে সম্প্রীতির ঐক্যের ভিপি প্রার্থী অমর্ত রায়ের প্রার্থিতা জোরপূর্বক এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাতিল করার মধ্য দিয়ে।
নির্বাচনে বিচ্ছিন্নভাবে ওঠা বাকি অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে, দেরিতে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়া, ব্রেইল না থাকায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ভোট অন্যজনের দেওয়ায় বিপত্তি, বিভিন্ন হলে আধা ঘণ্টার মতো ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকা, ভোটারদের সারি থাকার পরও কয়েক ঘণ্টায়ও প্রত্যাশিত সংখ্যক ভোট না পড়া, ভোটদানের পর আঙুলে অমোচনীয় দাগ না দেওয়া।
এ ছাড়া, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসংগতি, গাফিলতি, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের তিন শিক্ষক।
এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ৭৪৩। এর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৭২৮ এবং ছাত্র ৬ হাজার ১৫ জন। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১৭৭ জন প্রার্থী। ভিপি পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ৮ জন, যুগ্ম সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন এবং যুগ্ম সম্পাদক (পুরুষ) পদে লড়েছেন ১০ জন প্রার্থী। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসক হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে হল সংসদ নির্বাচনও।









