পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি আদালত ২০২৩ সালের সহিংস দাঙ্গার সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো ও সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগে সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন সাংবাদিক, দুইজন ইউটিউবার এবং দুইজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের বিচারক তাহির আব্বাস সিপ্রা এই রায় ঘোষণা করেন। অভিযুক্তদের কেউই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা পাকিস্তান ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দোষী সাব্যস্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সম্পাদক শাহীন শেহবাই, সাংবাদিক সাবির শাকির ও মোঈদ পিরজাদা, ইউটিউবার ওয়াজাহাত সাঈদ খান ও হায়দার রাজা মেহেদী এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আদিল রাজা ও আকবর হুসেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, ২০২৩ সালের মে মাসে দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে যে সহিংস অস্থিরতা দেখা দেয়, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে এই সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই সময় খানের হাজার হাজার সমর্থক সামরিক স্থাপনায় হামলা, সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ, একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার বাসভবনে লুটপাট এবং রাষ্ট্রীয় রেডিও পাকিস্তান ভবনে ভাঙচুর চালায়।
প্রসিকিউশনের দাবি, প্রকাশ্যে ইমরান খানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিরা ২০২৩ সালের ৯ মে দাঙ্গার সময় জনগণকে সহিংসতায় উস্কে দেন। সে সময় খান তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে ইমরান খানের বিরুদ্ধেও সামরিক ও সরকারি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন সাবির শাকির—যিনি এআরওয়াই টিভির জনপ্রিয় উপস্থাপক ছিলেন। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিষয়ে তিনি অবগত। শাকির দাবি করেন, দাঙ্গার সময় তিনি পাকিস্তানে ছিলেন না। তার ভাষায়, “আমার এবং অন্যদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় রাজনৈতিক নির্যাতন ছাড়া আর কিছুই নয়।”
তিনি জানান, দাঙ্গার আগে তিনি সৌদি আরবে হজ পালনের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন এবং পরে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। তার অভিযোগ, আদালত তার আইনজীবীর যুক্তি না শুনেই তার অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে।
অন্য দণ্ডপ্রাপ্তদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, সাতজনের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে সাত দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা পাকিস্তানে ফিরলে যেন পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বলছেন, পাকিস্তানে বাকস্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। যদিও শেহবাজ শরীফের সরকার দাবি করছে, তারা বাকস্বাধীনতার পক্ষে, তবে সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা মেনে চলাও জরুরি।









