গাজায় যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলের একঘরে হয়ে পড়ার চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক এখন প্রশ্ন তুলছেন—ইসরায়েল কি সাউথ আফ্রিকার মতো একটি ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কৃত বা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হয়ে উঠছে?
আজ (১৬ সেপ্টেম্বর) শুক্রবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, ১৯৯০ সালের আগে সাউথ আফ্রিকা বর্ণবাদী নীতির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়েছিল—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অবরোধে। শেষমেশ, বর্ণবাদের অবসান ঘটে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি তেমন একটি ‘মুহূর্ত’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
আন্তর্জাতিক চাপে নাজেহাল নেতানিয়াহু সরকার
ইসরায়েলের ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় তিনি এখন অনেক দেশেই ভ্রমণ করতে পারছেন না। জাতিসংঘে ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম ও কানাডা ঘোষণা করেছে, তারা আগামী সপ্তাহেই ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এদিকে, কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো দোহায় জরুরি বৈঠকে বসেছে। অনেকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনার আহ্বান জানাচ্ছেন।
ইউরোপজুড়ে নতুন নিষেধাজ্ঞা
বেলজিয়াম এবং স্পেন ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বেলজিয়াম অবৈধ বসতিগুলো থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, ইসরায়েলি কোম্পানির সঙ্গে সরকারি চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে এবং চরমপন্থী মন্ত্রীরা ও সহিংস বসতি বাসীদের ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে।
স্পেনও অস্ত্র রপ্তানিতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, গাজায় যুদ্ধাপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং যুদ্ধবাহী জাহাজ ও বিমানের নিজ ভূখণ্ডে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। নরওয়ের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ২৩টি ইসরায়েলি কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাণিজ্যিক চুক্তির কিছু অংশ স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও চাপ
ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা থেকে ইসরায়েলকে বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও স্লোভেনিয়া। হলিউডে ৪ হাজারের বেশি শিল্পী ইসরায়েলি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা, উৎসব ও সম্প্রচার মাধ্যম বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন। স্পেনে সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ভুয়েলতা দে এস্পানায় ইসরায়েলি দলের উপস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। ইসরায়েলি দাবা খেলোয়াড়দের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে না দেওয়ায় তারা প্রতিযোগিতা ছেড়ে দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি নেতারা এসব চাপের মোকাবেলায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার স্পেনের নিষেধাজ্ঞাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন, ইসরায়েল এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন। তিনি দেশের শিল্প খাতকে আরও স্বনির্ভর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও মতবিভাজন
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বরাক ও এহুদ ওলমার্ট নেতানিয়াহুকে ‘আন্তর্জাতিকভাবে দেশকে একঘরে করে ফেলা’র জন্য দায়ী করেছেন।
সাবেক কূটনীতিক জেরেমি ইসাখারফ বলেছেন, ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান এতটা খারাপ হয়েছে, তা অতীতে কখনো দেখিনি। তবে তিনি মনে করেন, এখনই দক্ষিণ আফ্রিকার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়নি—তবে সেটা আসন্ন।
সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকা দূত ইলান বারুখ বলেন, আমরা যদি আবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থান পেতে চাই, তাহলে এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এখনও একঘরে নয়
ইসরায়েল এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সমর্থন পাচ্ছে। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক অটুট থাকবে।
বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল লেভি বলছেন, ইসরায়েলের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু সেটা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে গাজা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
ইসরায়েল এখন এক সংকটময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক চাপ, বয়কট ও নিষেধাজ্ঞা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। তবে সাউথ আফ্রিকার মতো একটি মৌলিক পরিবর্তনের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের ঐক্য, বিশেষত ইউরোপ ও আমেরিকার একমত হওয়া জরুরি। নেতানিয়াহুর সরকার কী এই চাপের মুখে নীতিগত পরিবর্তন আনবে, নাকি আরও একঘরে হয়ে নিজেদেরকেই ‘নির্ভরযোগ্য বন্ধু’ বানানোর পথে এগোবে, তা সময়ই বলবে।









