ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তেহরানের প্রতি দেওয়া হুমকির নিন্দা জানাতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে দেশটি।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি শুক্রবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) সভাপতিকে চিঠি লিখে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘বেপরোয়া ও উস্কানিমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, এসব বক্তব্য জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
চিঠিটি প্রকাশ পায় ট্রাম্পের এক মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। ট্রাম্প বলেছিলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে চলমান বিক্ষোভে যদি আরও বিক্ষোভকারী নিহত হন, তবে যুক্তরাষ্ট্র “প্রস্তুত অবস্থায় এগিয়ে আসবে”।
ইরাভানি চিঠিতে বলেন, “অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে বাহ্যিক চাপ বা সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার যেকোনো প্রচেষ্টা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন।”
তিনি আরও বলেন, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার সহজাত অধিকার পুনর্ব্যক্ত করছে এবং প্রয়োজনে “নির্ণায়ক ও আনুপাতিক” পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। ট্রাম্পের হুমকি ও তার ফলে সৃষ্ট উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই সম্পূর্ণ দায় বহন করতে হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, শুক্রবারও দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। রাজধানী তেহরান ছাড়াও কোম, মারভদাশত, ইয়াসুজ, মাশহাদ ও হামেদানে বিক্ষোভ দেখা গেছে। তেহরানের তেহরানপারস ও খাক সেফিদ এলাকাতেও লোকজন জড়ো হন।

রোববার তেহরানে দোকানদাররা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করলে দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। চলমান অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত নয়জন নিহত এবং ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া কোম প্রদেশে হাতে থাকা একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে আরও একজন নিহত হয়েছেন বলে জানান প্রাদেশিক ডেপুটি গভর্নর, যা তিনি অস্থিরতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা বলে উল্লেখ করেন।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যদি “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে হত্যা করে”, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের “রক্ষায় এগিয়ে আসবে”।
এর জবাবে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানি বলেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই বিপন্ন করবে।
প্রায় এক কোটি মানুষের শহর তেহরানসহ ইরান বহু বছর ধরে তীব্র খরা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। এসব সংকটই সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এবারের পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব তুলনামূলক সমঝোতামূলক সুরে কথা বলছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতির জন্য সরকার আংশিকভাবে দায়ী এবং সমাধান খোঁজার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, অতীতের বিক্ষোভে সরকারের কঠোর অবস্থানের তুলনায় এবারের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। ট্রাম্প সেই হামলাকে “অত্যন্ত সফল” বলে বর্ণনা করেন। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি পারমাণবিক বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে “কঠোর জবাব” দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।









