চলমান গাজা যুদ্ধে সাহায্যকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় ইসরায়েলকে বিশ্বের সবচেয়ে মিথ্যুক রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করছে বিশ্ববাসী। এই ঘটনায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) প্রথমে দাবি করেছিল, গাজায় সাহায্যকর্মীদের গাড়ির বহরটি কোনো হেডলাইট বা জরুরি সংকেত ছাড়াই চলছিল। তাই তাদের ‘সন্দেহজনক’ মনে হওয়ায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। কিন্তু একটি ভিডিও প্রকাশের পর তাদের এমন মিথ্যা আচরণ সামনে আসে।
রোববার (৬ এপ্রিল) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজসহ আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, সাহায্যকর্মীদের অ্যাম্বুলেন্সগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল এবং তাদের আলো জ্বলছিল। এরপর ইসরায়েলি বাহিনী তাদের উপর হামলা করে।
মূলত, ভিডিও প্রকাশের ফলে ইসরায়েলের দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এবং অনেকে ইসরায়েলকে বিশ্বের সবচেয়ে মিথ্যুক রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করছেন।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় অফিসের প্রধান জোনাথন হুইটাল জানান, ঘটনার পর ১৫ জন সাহায্যকর্মীর লাশ একটি ‘গণকবর’ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) কর্মী ছিলেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রথমে দাবি করেছিল, তদন্তে দেখা গেছে গাড়িগুলোর কোনো হেডলাইট বা জরুরি সংকেত ছিল না। তাই তাদের ‘সন্দেহজনক’ মনে হওয়ায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। কিন্তু পিআরসিএস-এর পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা ছিল এবং তাদের লাল আলো জ্বলছিল।
আইডিএফ-এর এক ব্রিফিংয়ে বলা হয়, হামাসের একটি পুলিশের গাড়ি তেল সুলতান এলাকায় যাওয়ার পরপরই অ্যাম্বুলেন্সগুলো রাফাহের ওই এলাকায় পৌঁছায়। একটি আইডিএফ নজরদারি বিমান অ্যাম্বুলেন্সগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং মাটিতে থাকা সেনাদের সতর্ক করে। আইডিএফ জানায়, তারা ওই ফুটেজ প্রকাশ করবে না।

আইডিএফ এর দাবি, অ্যাম্বুলেন্সগুলো পৌঁছালে সেনারা তাদের হুমকি মনে করে গুলি চালায়। সেনারা দাবি করেছে যে তারা অ্যাম্বুলেন্সের বহরটি রাস্তায় থামতে দেখে এবং বেশ কয়েকজন দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দৌড়াতে শুরু করে। সেনারা জানত না যে, সন্দেহভাজনরা আসলে নিরস্ত্র চিকিৎসাকর্মী ছিলেন। ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানাননি, গাড়িগুলোতে গুলি চালানোর সময় সেনারা কত দূরে ছিল।
আইডিএফ স্বীকার করেছে, অ্যাম্বুলেন্সগুলোর আলো বন্ধ ছিল বলে তাদের যে দাবি ছিল, তা ভুল ছিল। সেনাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ওই দাবি করা হয়েছিল। নতুন প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা ছিল এবং তাদের আলো জ্বলছিল। আইডিএফ জানায়, এই অসঙ্গতি খতিয়ে দেখার জন্য পুনরায় তদন্ত করা হবে।
সাহায্যকর্মীদের লাশ গণকবরে চাপা দেওয়ার বিষয়ে আইডিএফ তাদের ব্রিফিংয়ে বলেছে, বন্য কুকুর এবং অন্যান্য প্রাণী যাতে লাশ খেতে না পারে, তাই এটি একটি অনুমোদিত এবং নিয়মিত অনুশীলন।
এছাড়া অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেন চাপা দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়েও আইডিএফ কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। আইডিএফ জানিয়েছে, নিহত ১৫ জনের মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে হামাসের যোগসূত্র ছিল, তবে এই দাবির সমর্থনে তারা কোনো তথ্যও প্রকাশ করেনি।
পিআরসিএস-এর সভাপতি ড. ইউনুস আল খতিব জানান, নিহত কর্মীদের একজনের ফোনে এই ঘটনার নতুন ফুটেজ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, তার লাশ থেকে ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি পুরো ঘটনাটি রেকর্ড করেছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তার শেষ কথা ছিল, ‘মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শুধু মানুষের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। আমি জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলাম।’
স্কাই নিউজ একটি ঘটনার পরের ভিডিও এবং স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে নতুন ফুটেজের অবস্থান এবং সময় যাচাই করেছে।
এতে স্পষ্ট হওয়া যায়, ২৩ মার্চ রাফাহের উত্তরে এই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল। এতে চিহ্নিত অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দক্ষিণ দিকে শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে দেখা যায়। বহরে দৃশ্যমান সব গাড়ির আলো জ্বলছিল।
স্কাই নিউজ-এর দেখা একটি স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায়, একই দিনে সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটে রাস্তার পাশে একগুচ্ছ গাড়ি জড়ো হয়েছিল।
এই ঘটনার পর ইসরায়েলের তথ্য প্রদান নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকে ইসরায়েলের এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।









