ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর চতুর্থ বিদেশি নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। তার এই সফরে শুধুমাত্র ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়, উঠে এসেছে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রসঙ্গও।
শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যচুক্তি, সামরিক ক্ষেত্রে সাহায্য, ২৬/১১-এর চক্রীকে ভারতে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি- এমন নানা বিষয় উঠে এসেছে মোদীর মার্কিন সফরে। যা নিয়ে রীতিমতো আলোচনা শুরু হয়েছে বিশ্ব কূটনৈতিক মহলে। কিন্তু মোদির সফরে থেকেই গেল ‘শুল্ক-কাঁটা’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম মোদি যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন। তার সফরের দিকে নজর ছিল সকলের। অবৈধবাসী ভারতীয়দের দেশে ফেরানো, ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে ভারতের উপর প্রভাব নিয়ে কী আলোচনা হয় সেই দিকে নজর ছিল। অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হলেও ট্রাম্প-মোদির বৈঠকে অধরা থেকেই গেল শুল্ক-সমাধান।
তবে কি দুই নেতার মধ্যে শুল্কনীতি নিয়ে আলোচনা হয়নি? ট্রাম্প জানান, আমেরিকা থেকে ভারতে আমদানিকৃত পণ্যে শুল্ক কমানো, আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খনিজ তেল এবং সামরিক বিমান কেনার বিষয়ে মোদির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তার।
শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনায় মোদির প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, উনি আমার চেয়ে আরও কঠিন এবং ভালো মধ্যস্থতাকারী। এই নিয়ে (আমাদের মধ্যে) প্রতিযোগিতা চলতে পারে না।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। বাণিজ্যচুক্তি থেকে শুরু করে ২৬/১১ মুম্বাই হামলার চক্রীকে ভারতে ফেরত পাঠানো- ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে দুই প্রধানের মধ্যে। তবে মোদির সফরের আগেই ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প জানান, শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তিনি ‘টিট ফর ট্যাট’ নীতি নিতে চান। অর্থাৎ, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে যত শুল্ক চাপাবে, সেই দেশের পণ্যেও যুক্তরাষ্ট্র তত শুল্ক চাপাবে।
ভারত নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, এই তালিকায় সবার প্রথমে রয়েছে ভারত। তার কথায়, ‘ভারত বড্ড বেশি কর নেয়!’ ভারতীয় পণ্যের উপর আগামী দিনে আরও বেশি হারে শুল্ক চাপাতে পারেন ট্রাম্প, সেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তিনি। সেই আবহেই মোদি-ট্রাম্পের সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, শেষে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের যৌথ সাংবাদিক বৈঠক হয়। তবে সেখানে নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেও ট্রাম্পের শুল্ক নীতি নিয়ে ‘নীরব’ই মোদি।
ভারতের সঙ্গে ‘অপূর্ব’ বাণিজ্যচুক্তি
ভারতের সঙ্গে ‘অপূর্ব’ বাণিজ্যচুক্তির পথে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে এমনটাই জানিয়েছেন ট্রাম্প।
বাণিজ্যচুক্তির রূপরেখা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা (ভারত এবং আমেরিকা) ইতিহাসের অন্যতম সেরা বাণিজ্যপথ ধরে কাজ করতে সম্মত হয়েছি। এই বাণিজ্যপথ ভারত থেকে শুরু হয়ে ইসরায়েল হয়ে, ইতালিকে ছুঁয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসবে।

সড়ক, রেল এবং সমুদ্রগর্ভস্থ পথে চলা এই বাণিজ্য দুই দেশের সহযোগী দেশগুলোকেও ছুঁয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে যে বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে, তা মেটাতে দু’পক্ষই দ্রুত আলোচনা শুরু করবে।
২৬/১১-র চক্রীকে ভারতে ফেরত পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প
মুম্বাই হামলার অন্যতম চক্রী তাহাউর রানাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। চলতি বছরের শুরুতেই রানার প্রত্যর্পণে সায় দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত।
বৃহস্পতিবার রানাকে ভারতে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বের অন্যতম শত্রু, যিনি ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় জড়িত, তাকে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার জন্য ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরে মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান।
অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধি করবে যুক্তরাষ্ট্র
২৬/১১ হামলার চক্রীকে ভারতে ফেরানো ছাড়াও দিল্লির হাতে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তুলে দেওয়ার ঘোষণাও করেছেন ট্রাম্প। যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদিকে পাশে নিয়েই ট্রাম্প জানান, ভারতকে সমরাস্ত্র বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করবে আমেরিকা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত জানুয়ারিতেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে বড় কিছু পদক্ষেপ করতে চলেছেন তিনি। একই সঙ্গে এটাও জানিয়েছিলেন যে, ভারতকে তার দেশ আরও বেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি করতে প্রস্তুত।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সেই বিষয়টিতে সবুজ সঙ্কেত দিলেন ট্রাম্প। শুধু এফ ৩৫ যুদ্ধবিমান নয়, ভারতকে ট্যাঙ্করোধী ক্ষেপণাস্ত্র জ্যাভেলিন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে।
এছাড়াও সি১৩০জে সুপার হারকিউলিস, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার থ্রি, পি-৮১ পোসাইডন বিমান, সিএইচ-৪৭এফ চিনুক, এমএইচ-৬০আর সিহকস, এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচে, হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র, এম ৭৭৭ হাউৎজ়ার এবং এমকিউ-৯বি মতো সামরিক সরঞ্জাম নিয়েও দু’দেশের মধ্যে কথা হয়েছে।
ঘাটতি মেটাবে তেল আর গ্যাস
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে আমেরিকার বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে রফতানি হওয়া পণ্যের তুলনায় ভারত থেকে সে দেশে রফতানি হওয়া পণ্যের পরিমাণ বেশি।
সেই অসামঞ্জস্য ঘোচাতে ভারত আরও বেশি খনিজ তেল যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার আশ্বাস দিয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ‘ভারতের স্বার্থেই’ এই অসামঞ্জস্য কাটানো প্রয়োজন বলে জানান ট্রাম্প। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে মূলত খনিজ তেল এবং গ্যাসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ভারত-চীন সমস্যা
প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) ভারত-চীন টানাপড়েনের আঁচ পড়েছে মোদি-ট্রাম্পের বৈঠকে। ভারত-চীনের সীমান্ত সমস্যা ঘিরে সংঘাতের সম্ভাবনা দূর করতে বৃহস্পতিবার মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদিকে সম্বোধন করে ট্রাম্প বলেন, এ বার আমি ভারতের প্রসঙ্গে আসছি। আমি সীমান্তে সংঘর্ষের আবহ দেখতে পাচ্ছি, যা খারাপ বিষয়। যদি সুযোগ থাকে আমি সাহায্য করতে চাই। কারণ, এটি বন্ধ করা উচিত।
কিন্তু ভারত-চীন সমস্যায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘নাক গলানো’ পছন্দ-না ভারতের। বিদেশ মন্ত্রক শুক্রবার নাম না করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব কার্যত খারিজ করেছে। সমাজমাধ্যমে বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য- যেকোন প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের যে সমস্যাই থাকুক না কেন, আমরা সব সময়ই তার সমাধানের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পন্থা অনুসরণ করেছি।
ট্রাম্পের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতেই মিস্রীর ওই মন্তব্য বলে মনে করা হচ্ছে।
অবৈধবাসী ভারতীয়দের ফেরত নিতে প্রস্তুত ভারত
আমেরিকায় অবৈধভাবে বসবাস করা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রথম দফায় ১০৪ জন অবৈধবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে পাঠানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েই মোদি জানিয়ে দিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে সকল ভারতীয় অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত ভারত।
সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে পাকিস্তানকে বার্তা
মোদি-ট্রাম্প বৈঠক শেষে সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। মোদি এবং ট্রাম্পের ওই যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানকে। বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য চেষ্টা করতে হবে পাকিস্তানকে। তাদের মাটি ব্যবহার করে যাতে সীমান্তে সন্ত্রাসবাদী হামলা কেউ চালাতে না-পারে, পাকিস্তানকেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতিতে পাকিস্তানের উল্লেখেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সে দেশের বিদেশ বিষয়ক মুখপাত্র শাফকাত আলি খান। শুক্রবার তিনি জানান, এই ধরনের বিষয়ে পাকিস্তানের উল্লেখে তিনি বিস্মিত। পাকিস্তান যে আত্মত্যাগ করেছে, তাকে গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না।
আদানি ঘুষ-মামলা নিয়ে আলোচনা?
যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিক বৈঠকে ওঠে আদানি ঘুষ-মামলার প্রসঙ্গও। ওই বৈঠকে এক সাংবাদিক মোদিকে প্রশ্ন করেন, আদানি ঘুষ-মামলা নিয়ে কি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে?
প্রশ্ন শুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিষয় উত্থাপিত হয় না। তিনি বলেন, ভারতে বসুধৈব কুটুম্বকম আদর্শে তৈরি গণতন্ত্র রয়েছে। প্রতিটি ভারতীয় এই পরিবারের সদস্য। আমরা ব্যক্তিগত বিষয়কে দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার মধ্যে আনি না। এবিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে









