যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতি ও প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর বিপুল ঋণ সংকটে পড়েছিলেন ভারতের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি গৌতম আদানি। মার্কিন ও ইউরোপীয় ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করলেও ভারত সরকার তার জন্য তৈরি করেছিল বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা— এমন তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।
শুক্তবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (ডিএফএস), রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (এলআইসি) এবং সরকারি নীতি-গবেষণা সংস্থা নীতি আয়োগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল এলআইসির তহবিল থেকে আদানি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা।
আদানির সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে বিতর্ক চলছে। আদানিকে মোদির রাজনৈতিক মিত্র ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই তাদের সম্পর্কের সূচনা। মোদি যখন ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন আদানি গ্রুপের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হতে শুরু করে— জ্বালানি, বন্দর, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতেও। সমালোচকরা মনে করেন, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আদানি গ্রুপের জন্য সুবিধাজনকভাবে নেওয়া হয়েছে।
এই বিনিয়োগ অনুমোদনের সময়, অর্থাৎ চলতি বছরের মে মাসে, আদানির বন্দর-সংক্রান্ত কোম্পানিকে প্রায় ৫৮৫ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করতে হতো বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের জন্য। পরবর্তীতে আদানি গ্রুপ ঘোষণা দেয়, এই অর্থের পুরোটা দিয়েছে একক বিনিয়োগকারী এলআইসি— যা বিরোধী দল ও অর্থনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সরকারি তহবিলের অপব্যবহার বলে সমালোচকদের অভিযোগ, কিন্তু সরকারপক্ষ বলছে— এটি ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির একটি কৌশল।
ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা ডিএফএসের অভ্যন্তরীণ নথিতে লেখা রয়েছে, পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আদানি গ্রুপের প্রতি আস্থা প্রদর্শন করা এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা। নথিতে আদানিকে বর্ণনা করা হয়েছে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোক্তা হিসেবে, যার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অসাধারণ স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণও বটে। কারণ, ২০২৩ সালে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ নামের একটি মার্কিন সংস্থা আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলআইসির বিনিয়োগমূল্য প্রায় ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার কমে যায়, যদিও ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ এর কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে) গত বছর আদানি, তার ভাতিজা সাগর আদানি এবং ছয় সহযোগীর বিরুদ্ধে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের প্রতারণা ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ আনে। একই দিনে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা দায়ের করে।
তবে এই ঘটনায় এখনো কোনো মন্তব্য করেনি ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়, এলআইসি বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দপ্তর। আদানি গ্রুপ অবশ্য সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেছে, আমরা আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের প্রবৃদ্ধি মোদি নেতৃত্বের আগেই শুরু হয়েছিল।









