বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে শাফিন আহমেদ শুধু একটি নাম নন, তিনি একটি যুগ! ‘মাইলস’ ব্যান্ডের অন্যতম প্রাণ, কণ্ঠশিল্পী ও সুরস্রষ্টা হিসেবে তিনি যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা আজও অগণিত শ্রোতার স্মৃতিতে অম্লান। ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘নীলা’, ‘প্রত্যাশা’ কিংবা ‘জ্বালা জ্বালা’—তার কণ্ঠের গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) ছিলো এই কিংবদন্তী শিল্পীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এদিন তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন দেশের সংগীতপ্রেমীরা। বিশেষ করে ‘সোনার বাংলা সার্কাস ’ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও ভোকাল প্রবর রিপন সামাজিক মাধ্যমে একটি আবেগঘন দীর্ঘ লেখা পোস্ট করেন, যা অন্য এক শাফিন আহমেদকে আবিস্কার করে! প্রবর রিপনের লেখাটি নিচে হুবুহু তুলে ধরা হলো-
স্মৃতিতে শাফিন আহমেদ
আমার আগের প্রজন্মের, আগের বলতে আমাদের কৈশোরে বা অতি তারুণ্যে যারা কিংবদন্তী মিউজিশিয়ান, তাদের ভেতরে ৪ জনের খুব কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, শাফিন আহমেদ ভাই, কমল ভাই, নীলয় দাশ দা এবং কফিল আহমেদ ভাই। শাফিন ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় খুব কাকতালীয়ভাবে। আমি একটি ঘরোয়া পরিবেশে গান গাচ্ছিলাম , হঠাৎ শাফিন ভাই এসে হাজির হন। ঘরোয়া পরিবেশে সাধারণত যা হয়, রবীন্দ্র সংগীত, আধুনিক বাংলা গান, লালন গীতি এইসব গাচ্ছিলাম। শাফিন ভাইকে দেখে গেয়ে উঠি পিংক ফ্লয়েড এবং আমার নিজের তথাকথিত মন খারাপ করা লিরিকের গান। তো আমি অনেক সময় গেয়েছিলাম বিচিত্র গান। গান শেষ হলে শাফিন ভাই আমাকে এসে ছাদে ডেকে নিয়ে যান, জিজ্ঞেস করেন, আমি এত বিচিত্র ধরণের গান গাওয়া কোথা থেকে শিখেছি। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, তাকে বলেছিলাম “রাস্তা থেকে শিখেছি, রাস্তাই তো সব ধরনের গান ভেসে বেড়ায়”। উত্তর উনার খুব ভালো লেগেছিলো। তখনও ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ শুরু করিনি, আর ‘মনোসরণি’ ভেঙে গেছে। জিজ্ঞেস করেছিলেন “আমাকে মানুষ চেনে না কেনো? এ্যালবাম বের হয়েছে কিনা?” বলেছিলাম ‘মনোসরণি’র একটা এ্যালবাম বেরিয়েছে, কিন্তু যার রেকর্ডিং এবং সাউন্ড আমার একদম পছন্দের নয়। উনি আমার ফোন নম্বর নিয়েছিলেন, বলেছিলেন ‘আমি চাই মানুষ তোমাকে গায়ক হিসেবে চিনুক’। এরপর সেই ঘরোয়া আড্ডায় আরো অনেক বার দেখা হয়েছিলো, এমনকি এক সাথে দুজন গেয়েও ছিলাম। আমাদের প্রায় ফোনে যোগাযোগ হতো।
একদিন আমাকে এবং আমার প্রেমিকাকে মাইলস এর প্র্যাক্টিসেও নিয়ে গিয়েছিলো। আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম উনাদের প্র্যাকটিস করার ধরন দেখে। টানা ৩ ঘণ্টা ২৫টার উপর গান প্র্যাকটিস করলো কোনো বিরতি ছাড়া! ভাবছিলাম কীভাবে সম্ভব! যেহেতু আমরা মোটামুটি দুইটা গান প্র্যাকটিস করার পর সিগারেট খাওয়ার জন্য বিরতি নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যেতাম। তখন বুঝেছিলাম ৩০-৪০ বছর ধরে কীভাবে তারা মিউজিক সিন কাঁপিয়ে যাচ্ছে, এবং লাইভে কেনো এখনো যেকোনো তরুণ ব্যান্ডের চেয়েও দুর্দান্ত। সেদিন আমার দারুণ একটা শিক্ষা হয়েছিলো মিউজিকের পরিশ্রম ও পেশাদারিত্ব সম্পর্কে। যে শিক্ষা আমি এখন আমার নিজের ব্যান্ডের ক্ষেত্রেও মেনে চলি। না চলে উপায় আছে? যে ব্যান্ডের পান্ডু ভাইয়ের মতো এত নিষ্ঠাবান এবং কঠোর পরিশ্রমী এবং নিয়মানুবর্তি মিউজিসিয়ান আছে। তো মাইলস এর প্র্যাকটিসের শেষে আমি একটা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। উনারা প্র্যাকটিস শেষে আমাকে বলে আমার গান তাদের শোনাতে। আমি কিছুটা শীতল হয়ে যাই, হামিন ভাই, শাফিন ভাই, মানাম ভাই, গ্রামে থাকতে যাদের গান উন্মাদের মতো শুনতাম, আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম তাদের ক্যাসেটের কাভারের দিকে। আর ভাবতাম এরা কি কোনো এলিয়েন, এত সুন্দর করে বাজায়, এরা কি মানুষ নাকি অন্যকিছু? বিশেষ করে প্রত্যাশা বা এ্যালবামের সেই রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এ্যালবাম কাভার।
কিন্তু ভয় কেটে যায়, কারণ গান গাওয়া বিষয়ে আমি যে ভয়ানক নির্লজ্জ, কারো সাথে কথা বলতে আড়ষ্ট হলেও, গান গাইতে বিব্রত হই না। পরে হামিন ভাইয়ের গিটার নিয়ে এপিটাফ, মৃত্যু উৎপাদন কারখানা শোনাই। আমি গান গাচ্ছি, আর আমার ছোটোবেলার আইকনরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে! চোখ বন্ধ করে গেয়ে ফেলি। গান শেষ হলে উনারা খুব প্রশংসা করেন, যেটার সময় আমি খুব বিব্রত ছিলাম। এখনো মনে আছে শাফিন ভাই – মানাম ভাই আর হামিন ভাইকে বলছেন “দেখেছো ছেলেটার কিন্তু দারুণ রক, আমি চিনতে ভুল করিনি”। সেই কথা আমার আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
এই অনুপ্রেরণা গুলোর খুব অভাব এখানে। কিন্তু শাফিন ভাই আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়ে যেতেন। ২০২০ এ যখন ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’ বের হয়, উনিই প্রথম আমাকে দারুণ প্রশংসা করে, এগিয়ে যেতে বলেন। এমনকি এ্যালবাম বের করার পর, আর তা মানুষের ভালো লাগার পরেও যখন আমাদেরকে কেউ কনসার্টে ডাকতো না। উনিই প্রথম কোনো বড় কনসার্টে আমাদের ডেকেছিলেন। যদিও কনসার্টটি পরে হয়নি। নিয়মিত আমার সাথে উনার কথা হতো। শাফিন ভাই, কমল ভাই আমাকে সব সময় হতাশ না হতে বলতেন, বলতেন “দেখো কেউ তোমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, যদি না তোমরা হাল ছেড়ে দাও”।
‘সোনার বাংলা সার্কাস’ নিয়ে শাফিন ভাইয়ের খুব উচ্চ ধারণা ছিলো, আমাকে সব না বললেও, শাফিন ভাইয়ের মৃত্যু পূর্ববর্তী শেষ যে ব্যান্ড ছিলো সেই ব্যান্ডের অনেকের কাছে, আমাদের ব্যান্ড নিয়ে খুব ভালো কথা বলতেন, আমি সেই ব্যান্ডমেটদের কাছেই তা শুনেছি।
আপনারা হয়তো শাফিন ভাইয়ের বাইরেরটা দেখে ভাবতেন, উনি খুবই রাশভারী মানুষ। বিশ্বাস করুন, কাছ থেকে দেখলে বুঝতেন, উনি খুবই শিশুর মতো মানুষ। আর ভেতরে এমন শিশুর সারল্য আর পারঙ্গমতা না থাকলে, এমন কঠিন কঠিন বেজলাইন বাজিয়ে এত সুন্দরভাবে গান গাওয়া যেতো না। উনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, চির তরুণ থাকতে হবে একজন রক মিউজিশিয়ানকে, শারীরিক ভাবে দারুণ ফিট থাকতে হবে, যেনো বার্ধক্য না আসে। অথচ সেই শরীরই তাকে বলা যায় অকালে নিয়ে চলে গেলো। ডাক্তারের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও মিউজিকের প্রেমে বিমান ভ্রমণ করলেন, কনসার্টে কনসার্টে গান গেয়ে বেড়ালেন, আর গান গাওয়া শেষেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন! উনার লাস্ট ব্যান্ডের ড্রামার সামিউল এর কাছে শুনেছি, উনি একবার স্টেজে গান গাওয়ার সময়, মাইনর হার্ট এ্যাটাক করেন, অথচ হার্ট এ্যাটাকের চেয়ে উনি বেশী বিব্রত ছিলেন, গানের যে লাইনটা গাওয়ার সময় উনার এ্যাটাক হয়, সেই লাইনের সুর ছুটে গেছে বলে! একেই বলে – যে তার কাজকে সত্যি সত্যি ভালোবাসে, সে মাঝে মাঝে কাজকে তার জীবনের চেয়েও বেশী ভালোবেসে ফেলে।
শাফিন ভাই আমাদের ব্যান্ড যে ডাবল এ্যালবাম বের করছে শুনে খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। প্রায় জিজ্ঞেস করতেন কবে আসবে, আমি শুনবো। আমাকে আজীবন এটা পোড়াবে যে, শাফিন ভাই তা শুনে যেতে পারলেন না। তার আগেই মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে গেলো সব গানের ওপারে। আর গত বছর যখন উনি আমেরিকাতে মারা গেলেন, তখন দেশে কি দমবন্ধ অবস্থা, অজস্র মৃত্যুর ভেতর তার মৃত্যু যেনো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। তাকে যখন শেষ দেখতে গেলাম সমাধিস্থ হওয়ার সময়- তখনও সে কি চাপা ভয় পথে পথে। আমার রক্তের কেউ নন উনি, তবু সমাধিতে নামানোর সময় মনে হলো রক্তের সেই প্রাচীন ধারার সাথে সম্পর্কিত যেনো কোনো সহোদরের শব নামানো হলো সমাধিতে। আর তার ভেতরে আমারও মৃত্যু হলো, কিন্তু আমার ভেতরে যা তার মৃত্যু হবে না আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
ভালোবাসা নিবেন শাফিন ভাই, স্বচক্ষে দেখা কিংবদন্তী, আমাকে নিয়ে আপনার উচ্চাশা যেনো ভুল প্রমাণিত না হয়- তার চেষ্টা করে যাবো আমার রক্তের শেষবিন্দু নিথর হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। ভালোবাসা নিবেন, আমার ভেতরে আপনার যে মৃত্যু নেই কখনো।
কমেন্টে একটা গানের লিংক দিচ্ছি। শাফিন ভাই ‘রিদম অফ লাইফ’ নামক একটা নাটকে অভিনয় করেছিলেন, সেই নাটকের টাইটেল গানটা আমি সুর করেছিলাম, আর গেয়েছিলেন উনি। আমার কি দারুণ সৌভাগ্য। আপনারা চাইলে শুনতে পারেন।









