কবরে শুয়ে আছেন কাফনে মোড়ানো তৌসিফ মাহবুব! তার শরীরের উপর দিয়ে যাচ্ছে বহু সাপ। ভিকি জাহেদের পরিচালনায় ‘খোয়াবনামা’ নাটকে এমন দৃশ্যের শুটিং করেছেন তৌসিফ!
সেই দৃশ্যের একটি পোস্টার ১২ আগস্ট সন্ধ্যায় এই অভিনেতা পোস্ট করেছেন তার ফ্যান পেজে। নেটিজেনরা দেখে চমকে গেছেন, পোস্টারটি প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেখে সবার মধ্যে হতভম্ব অবস্থা! অনেকে মনে করেছেন, দৃশ্যটি এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা; আবার কেউ বলছেন, কবরের দৃশ্য ও সাপগুলো গ্রাফিক্স করা!
পরবর্তীতে তৌসিফ ১৩ সেকেন্ডের একটি রিলস পোস্ট করেছেন। সেখানেও দেখা যায়, সাপগুলো সত্যি! কবরের মধ্যে তৌসিফ শুয়ে থাকা অবস্থায় একজন নারী তার গায়ের উপর সাপগুলো ছেড়ে দিচ্ছেন। সেগুলো বেয়ে তৌসিফের শরীরের উপর দিয়ে যাচ্ছে।
২০১৩-তে ‘অলটাইম দৌড়ের উপর’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে পথচলা শুরু হয় তৌসিফ মাহবুবের। গত ১৫ বছরে তিনি হাজারও নাটকে অভিনয় করলেও এমন দৃশ্যে আগে কখনও অভিনয় করেননি। এজন্য এই পরিস্থিতিতে শুটিং করা তৌসিফের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে।
বুধবার (১৩ আগস্ট) রাতে ‘খোয়াবনামা’র লোমহর্ষক শুটিং অভিজ্ঞতা নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে তৌসিফ মাহবুব বলেন,“সাপে ভয় পায় না এমন মানুষ আছে বলে মনে হয় না। সাপুড়ে নিজেও মাঝেমধ্যে ভয় পায়। সেখানে আমি তো সাধারণ মানুষ। একসঙ্গে ছয়টি সাপ কারো শরীরের উপর ছেড়ে দেয়া রসিকতার বিষয় না। ডিরেক্টর (ভিকি জাহেদ) যখন আমাকে দৃশ্যটির কথা বলেছিলেন, উনি ভেবেছিলেন আমি ইয়ার্কি করে হ্যাঁ বলেছি! কিন্তু কোনো এক অজানা সাহস থেকে আমি হ্যাঁ বলার পর মনে মনে চাচ্ছিলাম ডিরেক্টর যেন পরে না বলেন। কিন্তু উনিও রাজি হয়ে যান। তবে আমি মনে মনে চাচ্ছিলাম যেন এমনটা না হয়, আইডিয়াটা ইউনিক থাকায় ভিএফএক্স দিয়ে হয়তো করা যাবে। কিন্তু ভিকি ভাই কিভাবে যেন সাপগুলো ম্যানেজ করে ফেলেন, এবং যেহেতু আমি কথা দিয়েছি দৃশ্যটি করবো, কথা রাখার চেষ্টা করেছি। আসলে প্রথমে দশটি সাপ ওখানে ছেড়ে দেয়ার প্ল্যান থাকলেও ওই অঞ্চলে (মানিকগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম) ছয়টির বেশি সাপ খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
“কথা রাখতে গিয়ে, কিছুটা তো ভয়ভীতি পেয়েছি। তবে আমি অনেস্টলি কাজটি করেছি। আসলে যে কোনো কাজে ভালো করতে গেলে কিছুটা বাড়তি ডেডিকেশন দিতে হয়। যেহেতু আমি অভিনয়টাই করি, আমার কাজের ক্ষেত্রেও মাঝেমধ্যে কিছুটা রিস্ক নিতে হয়েছে। আমরা সবাই জানি, যে কোনো কাজে যে একটু এক্সট্রা ইফর্ট দেয়, সে ফলাফল হিসেবে একটু বেশি বেনিফিট আসে। এখানে ছয়টি সাপ আমার উপর দেয়া হয়েছিল, যদিও এগুলোতে বিষ নেই তারপরেও আমি ঘাঁটাঘাঁটি করে জেনেছি, সাপের ‘বেবিটুথ’ থাকে, যেখানে অনেকসময় বিষ ফেলার পরেও থেকে যায়। দৃশ্যটির শুটিং হয়েছিল রাত তিনটায়, সাপগুলো আনা হয়েছিল বিকেলে; তখন দেখেছি এগুলো ফনা তুলছিল। দৃশ্যটির সময় ডিওপি পাশে আসতে ভয় পাচ্ছিল। এই দৃশ্যটি ক্রেনে উঠিয়ে ক্যামেরা উপর থেকে নেয়া হয়। তখন বেদেনী আর আমি ছাড়া ওখানে তেমন কেউ ছিল না। বাকিরা ১০ফিট দূরে ছিল। আসলে আমি এই সাহস করে কীভাবে কাজটি করেছি জানি না, তবে আল্লাহর রহমত ছিল বলে পেরেছি।” -সাপের সাথে নিজের শুটিং অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই বলছিলেন তৌসিফ।
কাফনে মুড়িয়ে কবরে শোয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তৌসিফ বলেন,“কবরে শুয়ে জীবিত থেকে মৃত মানুষের চরিত্রে অভিনয় করার অনুভূতি শুনলে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, আমি ভনিতা করে বলছি। কিন্তু আমি সত্যি বলছি, কাট বলার পর থেকে ভয় শুরু হয়েছে, অ্যাকশন বলার পর ভয় চলে যায়। আমি কতটুকু অভিনেতা হতে পেরেছি জানি না, তবে যেহেতু এই পেশায় কাজ করছি আমাকে অভিনয় করতে হবে। সাপের ভয় তো ছিলই, কিন্তু আমি যেখানে শুয়ে ছিলাম ওটা সবাই দেখছে আমি শুয়ে ছিলাম; কিন্তু কোথায় শুয়ে ছিলাম? আমি কবরের মধ্যে শুয়ে ছিলাম। সাপের চেয়ে লাশ হয়ে কবরে শুয়ে থাকতে বেশি ভয়ে ছিলাম। দৃশ্যটির আগে আমার শরীরে কেউ কাফনের কাপড় বেঁধে দিচ্ছিল, জ্যান্ত মানুষ হয়ে একজন মানুষ হিসেবে এই অনুভূতি আমাকে বেশি নাড়া দিয়েছে। এটা হয়তো আমাদের সবাইকে একদিন ফেইস করতে হবে, এটাই আল্টিমেট ডেসটিনেশন। এগুলো আমরা মুখে বলি, মনে মনে ভুলে যাই। কিন্তু ওইদিন আমাকে এটা বেশি ধাক্কা দিয়েছে। জীবন্ত থেকেও মৃত মানুষের শেষ বিদায়ে যা হয় হয়, আমার সঙ্গে ওইদিন তাই হয়েছে। ওই দৃশ্য করতে প্রায় আধা ঘণ্টা কবরের মধ্যে ছিলাম এবং আমার সঙ্গে সাপ ছিল প্রায় পাঁচ মিনিট। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে, বউকে ফোন করে বলেছি দৃশ্যটা করতে যাচ্ছি দোয়া করো, যেটা সাধারণত করি না। এত বছরের ক্যারিয়ারে এমন কাজ কখনও করিনি।”
ভিন্ন কিছু করার সুযোগ পেয়েছেন জানিয়ে এসময় তৌসিফ বলেন,“২৮ আগস্ট ‘খোয়াবনামা’ রিলিজ হবে। তানজিন তিশাসহ অনেকে অভিনয় করেছেন, পোস্টারে দেয়া আছে। রিলিজের জন্য হাতে আছে ১৩ দিন। এই কদিন আমি কাজটি এবং আমার অভিজ্ঞতাগুলো অল্পঅল্প করে সোশ্যাল মিডিয়াতে সবার সঙ্গে শেয়ার করবো। কারণ, সবসময় এতো ভালো স্ক্রিপ্ট আসে না, যেখানে ভিন্ন কিছু করার সুযোগ হয়। এবার সুযোগটা যেহেতু কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি, বাকিটা দর্শকরা জানাবেন।”
সবশেষে তৌসফি বলেন,“জুনের শুরুতে ছয়দিন ধরে শুটিং করেছি। এই দৃশ্যের পর আমি মানসিকভাবে ট্রমাটাইজড হইনি, বরং আলোকিত হয়েছি। তবে ওখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। যে লোকেশনে শুটিং করেছি রাত তিনটায়, সেখানে যদি সাপে কামড় দিত বা অন্য দুর্ঘটনা ঘটতো সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসতে আসতে বড় কিছু ঘটে যেত। এখন আমার মনে হচ্ছে, আমরা অনেক ভুল করি, সময় থাকতে থাকতে শুধরে নেই।”









