রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা আমরা সবাই বলছি। কিন্তু সেই ক্ষতির পরিমাণ আসলে কত? কারা ক্ষতিগ্রস্ত? সুনির্দিষ্ট করে তা জানা প্রয়োজন। ধারণা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, হরতাল, অবরোধ, আগুন সন্ত্রাস, ডলার ক্রাইসিস, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটসহ সবকিছু মিলিয়ে ঝুঁকিতে আছে চার কোটির জীবিকা।
অনেক কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ বা আরও সুস্পষ্ট করে বললে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, সহিংসতা, অবরোধ, আগুন সন্ত্রাসই বড় কারণ। এর সরাসরি ভিকটিম হলো দৈনিক আয়ের মানুষ, যারা একদিনের আয়ের ওপর অনেককিছু নির্ভর করে এবং যার একদিনের আয় তাকে বাঁচিয়ে রাখে। এই দৈনিক আয়ের মানুষেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অর্থনীতি।
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, শুধু মাত্র ২৮ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের ডাকা মোট ছয় দিনের অবরোধ ও হরতালে দেশের অর্থনীতির আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।
তবে প্রথমেই যে ক্ষতি চোখে পড়ে তা হলো পরিবহন খাত। পরিবহন খাতে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাতে মোট ক্ষতি ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এইখানে মোট বলে যা বলে হচ্ছে, তা কিন্তু মোট থাকছে না বা কোথাও গিয়ে শেষ হচ্ছে না। এই ক্ষতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। একেক দিন অতিবাহিত হলে ক্ষতির পরিমাণ হুহু করে বাড়ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাতে মোট এই পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। হরতাল-অবরোধে ঢাকায় ৬৪টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং ১৫০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০টি বাস এবং ৪টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান।
গড় হিসাব করলে প্রতিদিন দাঁড়ায় ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এই ক্ষতির মধ্যে পরিবাহন খাতের শ্রমিকদের দৈনিক আয়, উপার্জন কিন্তু নেই। রয়েছে শুধু গাড়ি নষ্ট হওয়ার ক্ষয়ক্ষতি,যে ক্ষতির সাথে পরিবহন মালিকরা সরাসরি জড়িত।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমিক প্রায় ৫০ লাখ। আপনি শুধু ভাবুন, একদিনে ৫০ লাখ লোক বেকার বসে আছে হরতাল, অবরোধের কারণে। তাহলে তাদের সংসার চলবে কী করে?
৬ নভেম্বর অবরোধ চলাকালীন সময়ে সন্ধ্যায় এক পরিবহন শ্রমিক বলছেন, ‘মালিকের চোখ ফাঁকি দিয়া গাড়িডা লইয়া বাইর হইছি। মালিক গাড়ি বাইর করতে দেয় নাই সারাদিন। এইভাবে বইয়া থাকলে খামু কী?’
কথাগুলো যৌক্তিক। আসলেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা, আগুন সন্ত্রাস যাই বলি না কেন দৈনিক আয়ের মানুষজন একদিন কাজ বন্ধ রাখলে খাবে কী? আর রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, সহিংসতায় আগুন সন্ত্রাসে তাদের ক্ষতি ছাড়া লাভের কিছুই নেই। তারা তো রাজনীতি করতে আসছে না।
ক্ষতি কি শুধু পরিবহনে? ক্ষতি সমগ্র। আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী খাত হলো পোশাক শিল্প। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৩’ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজার হিস্যা ১ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তার মধ্যে ৮৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ অথবা ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
সেই খাতও এখন ক্ষতির মুখ দেখছে। আমরা সবসময় লাভের মুখের কথা বলি, তা তো আনন্দের। কিন্তু ক্ষতির মুখ যে কতটা ভয়াবহ তা এখন টের পাচ্ছে পোশাক খাত। অক্টোবরের শেষদিকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ সামগ্রিক কারণে পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
স্বাভাবিকভাবে যখন উৎপাদন কমে যায়, কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে। অনেক কোম্পানি লোকসানেও পড়ে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোম্পানিগুলো ব্যয় সংকোচন নীতিমালা হাতে নেয়। এতে কর্মী ছাঁটাই হয়, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় বেতন বকেয়া হয়ে পড়ে।
ক্ষতি আরও আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা, আগুন সন্ত্রাসের কারণে আমাদের পর্যটন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ এই খাতের আয় অঢেল। একসময় মানুষ পর্যটনে খুব বেশি আগ্রহী না হলেও এখন পর্যটনে অনেক বেশি আগ্রহী।
টোয়াবের তথ্য বলছে, দেশে পর্যটনের এক হাজার ৬৮টি গন্তব্য আছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনশিল্পের মোট অবদান ছিল ৭ হাজার ৮৩৩ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ২ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছে প্রায় ৫ দশমিক ২২ লাখ। সরাসরি ৫০ লাখ মানুষ পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত।

শুধু কক্সবাজার নয়; হরতাল-অবরোধের কারণে গত এক সপ্তাহে সেন্টমার্টিন, রাঙামাটি, বান্দরবান, কুয়াকাটা, সিলেটসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান এখন পর্যটকশূন্য। এতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, গত এক সপ্তাহে শুধু কক্সবাজারেই ক্ষতি হয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। আর সারাদেশে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
পর্যটন খাতে ধস নামানোর জন্য এইরকম অবরোধ বা হরতালই যথাযথ। এইরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে এই খাতের কর্মীরা অতি শিগগিরই বেকার হয়ে যাবে। ভাবুন, ৫০ লাখের মানুষ পর্যটন খাতে জড়িত, তাদের আয় আর বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা, আগুন সন্ত্রাসের কারণে। এইভাবে চলতে থাকে, এই খাত ধ্বংস হতে হতে ভয়াবহ অবস্থায় চলে যাবে।
২০১৪ সালে টানা অবরোধ ও হরতালে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির একটা হিসাব দাঁড় করিয়েছিল ডিসিসিআই। সংগঠনটির হিসাবে রাজনৈতিক অস্থিরতায় দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ২৭৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ওই হিসাবে সেই সময় ১৬ দিনে ব্যবসা-বাণিজ্যে ৩৬ হাজার ৪৪৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। এই হিসাবে ধরলে গত ৯ দিনের হরতাল-অবরোধে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা কেউ চায় না, এতে দৈনিক আয়ের মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাত। আর রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হতে খুব বেশিদিন সময় লাগে না। এই ক্ষতির উত্তাপ যদি সবাই বোঝে বিএনপি-জামায়াত কবে বুঝবে?
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







