১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সূচিত হয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। সে সময়টা ছিল মূলত দেশে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশকেই প্রাধান্য দেওয়ার, কিন্তু তার সরকার কৃষিকেও দিয়েছিল সমান গুরুত্ব।
কৃষিভিত্তিক সমাজকে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটিকেও তার সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রেখেছিল। যার প্রমাণ ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে গিয়ে বহুবার পেয়েছি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনবার তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন আমি বয়সে তরুণ। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে পারার বিষয়টা ছিল দারুণ উচ্ছ্বাসের। সবচেয়ে বড় কথা, সাক্ষাৎকারগুলো পূর্বনির্ধারিত ছিল না। আমি সাহস নিয়ে এগিয়েছি, তিনি অভয় দিয়েছেন।
ধানপাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকেও কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে রূপান্তর করার উদ্যোগ হিসেবে মৎস্যপক্ষ, পোলট্রি মেলা, যুবমেলা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছিল। ১৯৯৩ সালের কথা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন করা হয় পোলট্রি মেলা। তখন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। খুবই সজ্জন লোক।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ এবং এর সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মাটি ও মানুষ’ এ প্রচারিত পর্বগুলো তিনি খেয়াল করতেন। তিনিও চাইতেন শিক্ষিত তরুণদের মাঝে কৃষির অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দিতে। এখনকার মতো তখনও সরকারের বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল বেকারত্ব। তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহী করা গেলে বেকারত্ব কমবে।
আমার তুলে ধরা প্রতিবেদনগুলো দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত সম্পর্কে তাদের ধারণা পেতে সহায়তা করত। তাই নতুন কিছু প্রচার হলে তিনি প্রায়ই ডাকতেন, বিস্তারিত জানতে চাইতেন। পোলট্রি মেলার প্রস্তুতিপর্ব দেখতে যাওয়ার সময় নোমান সাহেব আমাকে সঙ্গে নিলেন। মেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনী সব দেখেশুনে নিতে এলো।
প্রথমবার দেখলাম একজন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য কত সতর্ক থাকতে হয়! প্রধানমন্ত্রী কত কদম হাঁটবেন, কোন কোন স্টলে যাবেন, কতটা সময় লাগবে সবই হিসাব করা। পরদিন সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে থেকে স্টল ঘুরছেন। মনে হলো, একজন কৃষি সাংবাদিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগের দ্বারপ্রান্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি।
যেভাবেই হোক প্রধানমন্ত্রীর একটা সাক্ষাৎকার নিতেই হবে। আমি ক্যামেরাম্যানকে ক্যামেরা ধরতে বললাম। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পূর্বানুমতি ছাড়া তার সাক্ষাৎকার নেওয়া যায় না। আমি সাহস নিয়ে ‘বুম’ হাতে এগিয়ে গেলাম। এর আগে কখনো তার সঙ্গে আমার দেখা বা কথা হয়নি। আমার এগিয়ে যাওয়া দেখে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর চোখমুখে এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম, বুঝতে পারছিলাম আমাকে থামিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাদের ইশারা করলেন, যার অর্থ ‘আসতে দাও’।
প্রধানমন্ত্রীর দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলাম। খুব স্বাভাবিক নরম কণ্ঠে তিনি উত্তর দিলেন। কৃষি বিষয়ে সরকারের নানান পরিকল্পনার কথা জানালেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ভালো লাগার বিষয় ছিল, তিনি যখন বললেন, সরকারের একার পক্ষে তো সব সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে, আপনি যে কাজটা করছেন, সেটাও কিন্তু আমাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।
উন্নয়ন সাংবাদিক হিসেবে আমার জন্য তার এই মূল্যায়ন ছিল পরম প্রাপ্তি। আমি কল্পনাও করতে পারিনি প্রধানমন্ত্রী আমাকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার এই সুযোগটুকু দেবেন। এরপর একাধিকবার তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। যুবমেলায় কিংবা খুলনায় মৎস্যপক্ষে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সেগুলোও পূর্বনির্ধারিত ছিল না। তার কাছে মাইক্রোফোন হাতে সরসরি চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে (১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬) তার সরকারের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন নীতিতে কৃষকবান্ধব প্রকল্প অনুমোদন, যেমন সমন্বিত চাষ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প, গভীর নলকূপ স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও তথ্যসেবা সম্প্রসারণ, আলুবীজ ও ভুট্টা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, পশুসম্পদ ও মৎস্য উন্নয়ন, উপকূলীয় চর বনায়ন ও ইকো-পার্ক স্থাপন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পাশাপাশি বিএসআরআই, জাতীয় উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রসহ গবেষণা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, মানসম্মত বীজ বিতরণ এবং সেচ ও পানিব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানো হয়। তার সরকারের সময়ে খাল খনন ও খাল পুনঃস্থাপন নীতি ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে এবং খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষকের খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়ক হয়।
একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে গাছ লাগানো কর্মসূচি পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে এবং পশুপালন ও পোলট্রি উন্নয়ন নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ডেইরি ও পোলট্রি খাতকে এগিয়ে নেওয়া হয়। আমি সব সময় কাজটাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। মনে হয়েছে, আমার প্রতিবেদনগুলো দেখে যেন কৃষক তো বটেই, সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে গবেষক, কৃষি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও কৃষি সম্পর্কে ভাবতে পারেন। যা এখনো অব্যাহত আছে।
কাজটিকে আমার মতো করার সুযোগ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন খালেদা জিয়ার কাছ থেকে পেয়েছি। পেয়েছি তার মমতা ও দিকনির্দেশনা। তার মৃত্যু নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় শূন্যতা তৈরি করবে, শূন্যতা তৈরি হবে সামাজিক জীবনেও। বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তি কামনা করি।









