ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যে গত বছরের ৩ মে প্রথম সহিংসতা শুরু হয়। এরপর ১৬ মাস পেরিয়ে গেলেও সেখানে এখনও শান্তি ফিরে আসেনি। বরং সংঘর্ষ-সহিংসতা আরও বেড়েছে। গত সপ্তাহ থেকে রাজ্যটিতে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে এবং এতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১১ জন। আন্দোলন থামাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারন্টে পরিষেবাও।
বিবিসি জানিয়েছে, প্রায় চার মাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও সহিংস সংঘর্ষের কারণে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে মণিপুরে। ইম্ফলের কৌত্রুক এলাকায় সশস্ত্র আক্রমণে এক মহিলাসহ দুইজনের মৃত্যু হয়, আহত হন একাধিক ব্যক্তি।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা পাহাড় থেকে কৌত্রুক ও পার্শ্ববর্তী কাদাংবন্দের নিচু এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হতাহতের পাশাপাশি বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশেই রয়েছে কুকি জনবহুল পার্বত্য জেলা কাংপোকপি। অভিযোগ উঠেছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা কুকি সম্প্রদায়ভুক্ত। এরপর থেকেই বারে বারে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মণিপুরের পরিস্থিতি।
গত সপ্তাহে মইরাংয়ে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়। এই ঘটনায় এক বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এর পাশাপাশি মণিপুরের জিরিবাম জেলায় সহিংসতায় চারজন সন্দেহভাজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আসাম সীমান্তবর্তী জিরিবামের মংবুং গ্রামের কাছে এই হামলা চালানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, জিরিবামে মেইতেই সম্প্রদাইয়ের এক প্রবীণ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার পর সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকায় এখনও উত্তেজনা রয়েছে এবং পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, রাজ্যে সাম্প্রতিক হিংসায় অত্যাধুনিক ড্রোন ও আরপিজি (রকেট চালিত বন্দুক) ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের অস্ত্র সাধারণত যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। রাস্তা-ঘাটে অতিরিক্ত পুলিশ এবং নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে কয়েকদিন। বহু এলাকায় দোকানবাজার বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, সোমবার সকালে ইম্ফলে পুলিশের ডিজি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা-সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে রাজভবনের দিকে রওয়ানা দেয় মণিপুরের স্কুল এবং কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং নৈতিক কারণে ৫০ জন বিধায়কের পদত্যাগও দাবি করেন তারা। রাজভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভও করেন।
এদিকে, কুকিদের পক্ষ থেকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। সম্প্রদায়ের এক সদস্য প্রিম ভাইপেই বলেছেন, দরিদ্র কুকিদের কাছে এত আধুনিক অস্ত্র কোথা থেকে আসবে? যদি আমাদের কাছে অস্ত্রই থাকত তাহলে আমরা আমাদের ভিটে-মাটি ছেড়ে উদ্বাস্তুর মতো থাকতে বাধ্য হতাম? গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমার ভিটে-মাটি ছাড়তে বাধ্য হই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মণিপুরের এক বাসিন্দা আবার পাল্টা অভিযোগ করেছেন। তার কথায়, এখানে পরিস্থিতি যা তাতে রাস্তায় বের হওয়া দুষ্কর। কুকিদের সশস্ত্র সদস্যরা সর্বত্র হামলা চালাচ্ছে।
মণিপুরের সিনিয়র সাংবাদিক মায়ুম শর্মা বলেন, মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। রোববার রাতে প্রায় নয় শত নারী রাস্তায় মশাল হাতে নেমে এসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও করছেন। ছাত্ররা পথে নেমেছে, অবস্থান বিক্ষোভ করছে। এই দৃশ্য গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা দেখছি। বিষয়টা হলো প্রশাসন কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এখনও যদি পরিস্থিতি সামাল না দেওয়া যায় তাহলে সমস্যা বাড়বে।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রবীণ সাংবাদিক নিঙলুন হাংঘালও। তিনি বলেন, মণিপুরে আমার পরিচিতদের মুখে পরিস্থিতির কথা শুনেছি। বেশ উদ্বেগজনক অবস্থা। নতুনভাবে সহিংসতার ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে। যে ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে সে বিষয়েও তারা পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনায় যে ধরনের অত্যাধুনিক হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে তা আশঙ্কাজনক। সাধারণত কুকিরা এমন হাতিয়ার ব্যবহার করে না। দুই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীকেই এই হাতিয়ার ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে যা আরও উদ্বেগজনক। প্রশ্ন হলো, কারা যোগাচ্ছে এই অস্ত্র।
মণিপুরের পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায়, সেখানে মেইতেই এবং কুকি দুই সম্প্রদায়ের কাছে এখনো অস্ত্র রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এই দুই সম্প্রদায়ই পাহাড় ও উপত্যকায় বাংকার তৈরি করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও হস্তক্ষেপ করেছে কয়েক বার। এছাড়া রাজ্য সরকারও এ বিষয়ে বেশ তৎপর। কিন্তু তারপরও ১৬ মাস পেরিয়ে গেল। কিন্তু কোনো কিছুতেই থামছে না সহিংসতা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, গত বছরের মে মাস থেকে মণিপুরের অবস্থা ভয়াবহ থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি বেশ শান্তই ছিল। কিন্তু এখন সেখানে হামলার কাজে ড্রোন বোমা, আরপিজি ও আধুনিক অস্ত্রের জন্য ড্রোন ব্যবহারের পর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সর্বশেষ হামলার পর পুলিশ সার্চ অপারেশন শুরু করে। তখন ৭.৬২ মিমি স্নাইপার রাইফেল, পিস্তল, ইম্প্রোভাইজড লং রেঞ্জ মর্টার (পম্পি), ইম্প্রোভাইজড শর্ট রেঞ্জ মর্টার, গ্রেনেড, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ অনেক আধুনিক অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

এখন সবচেয়ে বেশি করে যে প্রশ্নটা উঠছে তা হলো, মণিপুরে সহিংসতা কেন থামছে না। এর অনেক কারণ রয়েছে। এই লড়াইটি মূলত এইটি মূলত দুটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে চলছে। তারা হলো কুকি এবং মেইতেই। মেইতেই সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ উপত্যকায় বাস করে এবং কুকি সম্প্রদায় পাহাড়ে। সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষই নিজেদের এলাকায় রয়েছে। দুই সম্প্রদায় একে-অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে তৈরি হচ্ছে অসন্তোষ। আর এর জন্য দুই সম্প্রদায় একে-অপরকে দোষারোপ করছে। তাতে অশান্তি বাড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দুই সম্প্রদায় নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে। তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। ফলে সুযোগ পেলেই তারা একে-অপরকে আক্রমণ করছে। তারপর নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। তবে উভয় সম্প্রদায় এত অস্ত্র কোথায় পাচ্ছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মণিপুরে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তা সাধারণত যুদ্ধে ব্যবহার করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ। মনে করা হচ্ছে, লুটপাট করে এই সব অস্ত্র তারা হাতে পেয়েছে।









