চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পলাতক আসামী শেখ হাসিনা ও সাবেক সরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তাদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী।
পাচ দিন প্রসিকিউসন পক্ষে যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষে আজ বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনাল-১ এ শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন শুরুতেই বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার করা মানে ‘হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে আসামিকে বলা হবে এখন সাঁতার কাটো।’
এসময় ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনি এটি কেন বলছেন? জবাবে এই আইনজীবী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ক্ষেত্রে আমাদের সাক্ষ্য আইন ও সিআরপিসি গ্রহনযোগ্য নয়। তাই আমি মনে করি এই সীমাবদ্ধতা ন্যায়বিচারকে বিঘ্নিত করেছে।’
যুক্তিতর্কের একপর্যায়ে আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরের বিভিন্ন বক্তব্য এই মামলায় তুলে ধরেছেন প্রসিকিউশন। কিন্তু কোনো সুশাসনের কথা বলা হয়নি। যদি বলতেন তাহলে আমি এক বাক্যে এসব মেনে নিতাম। তাই তাদের এই বক্তব্যটা মানতে পারছি না। কারণ আওয়ামী লীগের সময় কোনো দুঃশাসন ছিল না। তবে একটি পরিবারের কর্তা হিসেবে যেমন কিছু ভুলত্রুটি থাকে, তেমনি রাষ্ট্রের যিনি প্রধান থাকেন তিনিও ভুলে ঊর্ধ্বে নন। কারণ রাষ্ট্রের প্রধানের অনেক দায়িত্ব থাকে। তার একটা চেষ্টা থাকে রাষ্ট্রকে ভালোভাবে পরিচালনা করার জন্য। সেই চেষ্টায় হয়তো কিছু ভুল ত্রুটি হতেও পারে বা হয়েও যায়। ভালো উদ্যোগও অনেক সময় খারাপে পরিণত হয়।
আইনজীবী আমির হোসেন আরও বলেন, আমি মনে করি উন্নয়নের মহাসোপানে যাওয়া সময় ছিল এই আওয়ামী লীগের ১৫ বছর। কেননা এ সরকার এসে মেট্রোরেল, পদ্মাসেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের প্রায় জায়গায় অভাবনীয় উন্নয়ন করেছে। এছাড়া একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এই রাষ্ট্রকে উন্নীত করার যে প্রচেষ্টা, তা বাস্তবায়নে অনেকটা সফল হয়েছেন শেখ হাসিনা। এসব সফল যদি দুঃশাসন বলা হয়, তাহলে সুশাসন কাকে বলে আমি জানি না। ফ্যাসিবাদ শব্দটি মূলত একটি বয়ান। এসব বলে বলে একটি সরকারকে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছেন, এটাই একটি পরিকল্পিত বয়ানের অংশ।
এসময় আইনজীবী আমির হোসেনের উদ্দেশ করে প্রশ্ন রেখে ট্রাইব্যুনাল বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন-গুম, বেআইনি আটক, মিথ্যা মামলা, অপহরণ এই কাজগুলো কী?
জবাবে এই আইনজীবী বলেন, এসব আমি অস্বীকার করি। এগুলো প্রসিকিউশন বলেছে। তাদের সঙ্গে আমি একমত নই। সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছি। রাষ্ট্র চালাতে গেলে প্রয়োজনে অনেক কঠোর হতে হয়। সেই কঠোরতার ক্ষেত্রে কিছু ভুলত্রুটি হয়। এসব মেনে নিয়েই একটি রাষ্ট্র। আদি থেকেই এটা হয়ে আসছে। কিন্তু প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যেভাবে ঢালাওভাবে আনা হয়েছে এসব তাদের একেবারেই ব্যক্তিগত বয়ান। শেখ হাসিনার সরকারকে দীর্ঘদিনের শাসন থেকে অপসারণ করতে এটি তাদের একটি ডিজাইনেরই অংশ।
আসামিপক্ষের এসব যুক্তি উপস্থাপন শেষে পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামীকাল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।
এই মামলায় প্রসিকিউসন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এসএইচ তামিম শুনানি করেন। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে আছেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
ঐতিহাসিক এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতিক শহীদ আবু সাঈদের পিতাসহ স্বজন হারা পরিবারের অনেকে। এছাড়া স্টার উইটনেস হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ ইসলাম এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। সর্বমোট সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন সাক্ষী।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একপর্যায়ে এই মামলায় দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে (অ্যাপ্রোভার) রাজসাক্ষী হতে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের আবেদন মঞ্জুর করেন ট্র্যাইব্যুনাল। পরবর্তীতে এই মামলার রাজসাক্ষী হয়ে সাক্ষ্য দেন পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
এই মামলাটি ছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি হয়েছে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকার, এর দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব অপরাধের বিচার কাজ চলছে।









