সদ্য প্রয়াত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড মাইলসের সদস্যদের একটি স্মরণীয় সাক্ষাতের কথা প্রকাশ করেছেন হামিন আহমেদ। প্রায় তিন দশক আগের সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাইলসের এই শিল্পী বেগম খালেদা জিয়াকে একজন মার্জিত, মানবিক ও শিল্পীবান্ধব মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন।
হামিন আহমেদ জানান, ১৯৯৩–৯৪ সালের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারি বাসভবন, শহীদ মাইনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়িতে পারফর্ম করার আমন্ত্রণ পায় ব্যান্ড মাইলস। সে সময় ব্যান্ডটির সদস্য ছিলেন হামিন আহমেদ, শাফিন আহমেদ, মানাম এবং মাহবুব। হামিনের ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন- এই ভাবনাতেই আমরা সবাই ছিলাম ভীষণ উত্তেজিত, কৌতূহলী এবং কিছুটা নার্ভাসও।”
সেদিন প্রথমবারের মতো বেগম খালেদা জিয়াকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় বলে উল্লেখ করেন হামিন আহমেদ। তার ভাষায়, “তিনি ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল ও ব্যক্তিত্বময়, একই সঙ্গে অসাধারণভাবে ভদ্র ও আন্তরিক।” বাসভবনে উপস্থিত তারেক রহমান ও তার বন্ধুরাও শিল্পীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেন বলে তিনি জানান।
দুপুরে সাউন্ড চেক শেষে খাবারের সময় এক অনন্য ঘটনার কথা তুলে ধরেন হামিন আহমেদ। তিনি বলেন,“স্বভাবতই জিয়া পরিবারের সদস্যরা শিল্পীদের বাইরে কোথাও আপ্যায়নের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তখনই বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ়ভাবে বলেন,‘না, ওরা এই বাড়িতেই খাবে। আমরা যা খাব, ওরাও তাই খাবে।’এই কথাতেই সব সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। আমরা ডাইনিং টেবিলে বসি। কিন্তু তখন ঘটে আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনা- বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে আমাদের প্রত্যেকের প্লেটে খাবার তুলে দেন। আমি তখন নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম-এটা কি সত্যিই বাস্তব? দেশের প্রধানমন্ত্রী, অথচ এমন বিনয়, এমন মানবিকতা! সেই মুহূর্তে তাঁর প্রতি আমার মনে যে গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”
“সন্ধ্যায় যখন আমরা পারফর্ম করি, তিনি বাগানমুখী জালঘেরা এক জায়গায় বসে আমাদের গান শোনেন এবং পরে আমাদের গানগুলোর প্রশংসাও করেন। সেই দিনের প্রভাব আমার ও শাফিনের জীবনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। বছরের পর বছর ধরে তার প্রতি আমাদের, আমাদের পরিবার- এমনকি আমার মায়ের মনেও যে শ্রদ্ধা জন্মেছিল, তার মূল ছিল সেই দিনটি।” বলছিলেন হামিন আহমেদ।
তিনি আরও স্মরণ করেন, ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাঁর মা, প্রখ্যাত নজরুলসংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের মৃত্যুর পরের ঘটনাপ্রবাহ। হামিনের ভাষায়,“২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, আমার মা ফিরোজা বেগম যখন আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন— তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক শহীদ মিনারে গেলেও, এমন একজন শিল্পীর বাসায় এসে শ্রদ্ধা জানানোর মতো কেউ ছিলেন না, যিনি সারাজীবন জাতীয় কবির গানকে ধারণ ও সমুন্নত রেখেছেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেবল সংবাদমাধ্যমে একটি শোকবার্তা পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। ফিরোজা বেগমের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জানাজা বা দাফনের ব্যবস্থাও করা হয়নি। কিন্তু একজন মানুষ এক মুহূর্তও দেরি করেননি। অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি নিজে উপস্থিত হন কালিন্দীর আমাদের বাসায়- তিনি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে হামিন আরো বলেন,“মায়ের মৃত্যুর ওই সময়ে খালেদা জিয়া আমাদের সঙ্গে বসেন, আমার মায়ের স্মৃতি ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান, আমাদের সান্ত্বনা দেন ঠিক পরিবারের একজনের মতো।”
হামিন আহমেদ লেখেন, “তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ, মার্জিত ও দয়ালু মানুষ। সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি চিরকাল আমার স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।”
এসময় হামিন একটি ‘অপূর্ব কাকতাল’-এর কথাও তুলে ধরেন তার লেখায়। হামিনের ভাষায়,“এটি এক অপূর্ব কাকতাল- বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন ‘ফিরোজা’ নামের একটি বাড়িতে।”
সবশেষে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।









