ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময়ে পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি নিয়েছিলেন। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করতেন। এই কাজ করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়েছিল তার জীবন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বেছে নেন মানবসেবার ব্রত। তাই চাকরি ছেড়ে যোগ দেন হামদর্দে। একদম শেকড় থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে শিখরে নেয়ার দৃঢ় ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তার নেতৃত্বে হামদর্দ বিশাল এবং প্রতিষ্ঠিত এক পরিবার। তার অবদানেই হামদর্দ এখন বহুমুখী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। নানা খাতে সেবার হাত প্রসারিত করে হামদর্দকে এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি। দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ মোতাওয়াল্লী হিসেবে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ আয়ুর্বেদিক মেডিসিন ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশ সার্ভিসের দাপুটে চাকরি ছেড়ে ইউনানী-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ভুবনে কীভাবে ও কেন প্রবেশ করলেন-এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে আমার পুলিশ অফিসার হওয়ার কোনো স্বপ্ন ছিল না। ১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সুযোগ এলো পুলিশে চাকরি করার। তখন মনে হলো, পুলিশে থাকলে তো মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা যাবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে কাজ করা যাবে। সেই চিন্তা থেকেই আমি থেকে গেলাম। আমি ছিলাম তেজগাঁও থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার, ঢাকার এই অঞ্চলটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা, সহযোগিতা এবং তথ্য দেয়ার মতো স্পর্শকাতর কাজ ও উপকার আমার মাধ্যমে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমার জীবন বিপন্ন করে তুলেছিলাম। আমার বিরুদ্ধে নালিশ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে ডেকে পাঠালেন, উর্দু ভাষা ভালোভাবে জানা থাকার কারণে আমি তাৎক্ষণিক প্রজ্ঞা দিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা আমার প্রতি এত সন্তুষ্ট ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের পর অন্য পুলিশ অফিসাররা যখন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তখন আমার নামে মুক্তিযোদ্ধারা স্লোগান দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমার মনে হয়েছে, এই পেশায় থাকা আমার জন্য ঠিক হবে না। আমাকে আরও বড় মানব সেবার কাজ করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই হামদর্দে সম্পৃক্ত হওয়া। শুরু থেকেই আমার মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, হামদর্দকে আমি সফলভাবে এগিয়ে নিতে পারবো।
হামদর্দ বাংলাদেশকে নিজের মেধা, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, সাধনা ও অঙ্গীকার-প্রত্যয়ে গড়ে তুলতে কী কী সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রশ্নের উত্তরে জানান, অনেক প্রতিবন্ধকতা। অনেক চড়াই উতরাই। সে এক সুবিশাল ইতিহাস। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল হামদর্দ বিরোধী ষড়যন্ত্র। প্রকাশ্য ও গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অসংখ্যবার হামদর্দকে দখল করার চেষ্টা করা হয়েছে। পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি এবং ৬ গুণ দায়-দেনা নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম। ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল যে, হামদর্দ যেনো আদমজী, বাওয়ানী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো ধ্বংস হয়ে যায়, যাতে অবশিষ্ট যা কিছু থাকবে তাই তারা লুটেপুটে খেতে পারে, দখল করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিলে, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান উদার মনে সহযোগিতা করলে হামদর্দ আরও অনেকদূর এগিয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহর রহমত এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের দৃঢ় ঐক্যের কারণে সেইসব ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্যায়-অনিয়ম পর্যুদস্ত হয়েছে।

‘আপনি সব সময় খাঁটি মানুষ খুঁজে বেড়ান। তাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য কি রকম-’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা আসলে দক্ষ, যোগ্য এবং সৎ মানুষের সন্ধান সারাজীবন ধরেই করেছি এবং এখনও করি। দেশপ্রেম, মূল্যবোধ এবং যোগ্যতা যাদের আছে তারাই আমাদের কাছে প্রকৃত মানুষ। আমরা খুঁজে খুঁজে এ রকম অনেককেই হামদর্দে যুক্ত করেছি, যারা হামদর্দকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাকে প্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং করছেন। এই মানুষ খোঁজার প্রক্রিয়ায় তিক্ত ও মধুর অভিজ্ঞতা আছে অনেক। অনেক ভালো, যোগ্য ও দক্ষ মানুষ যেমন আমরা পেয়েছি, তেমনি অকৃতজ্ঞ ও বিশ্বাসঘাতক কিছু লোকও আমি পেয়েছিলাম, যারা হামদর্দকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। এরপর ষড়যন্ত্র করতে গিয়ে তারা ছিটকে পড়েছে প্রতিষ্ঠান থেকে। এসব লোক হামদর্দের কারণে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু ষড়যন্ত্র করায় এখন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
হামদর্দের ওষুধ রপ্তানির সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন রপ্তানি হয় না। প্রবাসীদের মধ্যে অনেকে বাংলাদেশ থেকে হামদর্দের ওষুধ বিদেশে নিয়ে যায়। তারা নিজেদের প্রয়োজন মেটায় এবং সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করে। এর আগে ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশে হামদর্দের ওষুধ পাঠানো হয়েছে। তবে হামদর্দ-এর ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করার প্রশাসনিক যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো শিগগিরই দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করছি। এজন্য শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে অব্যাহতভাবে চেষ্টাও করা হচ্ছে। এলোপ্যাথিক ওষুধের জন্য এ সংক্রান্ত যে আইন আছে, সেটি ইউনানী আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেই ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে সকল বাধা দূর হয়ে যাবে।
বাংলাদেশে ইউনানী, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ভবিষ্যত নিয়ে তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে ইউনানী আয়ুর্বেদিক ও হারবাল চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। আমাদের এ খাতের ভবিষ্যত খুবই উজ্জল। এই চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন সবার কাছে পরম আকাংখা। ঘরে ঘরে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য মুখিয়ে থাকেন মানুষ। শিল্প হিসেবেও এটি জাতীয় অর্থনীতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে এখন ইউনানী-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কাছে ফিরছে কোটি কোটি মানুষ। বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। এই খাত স্বীকৃতি লাভ করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ামুক্ত ওষুধ হিসেবে এখন ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হারবাল চিকিৎসার প্রতি ঝুঁকছে বিশ্বের অগণিত মানুষ। সেই বিপুল আলোড়নের ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশেও। এখন শুধু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পালা।

অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও নাকি ওয়াকফা আইন, বিধিমালা, রেওয়াজ-ঐতিহ্য সম্পর্কে ততটা ওয়াকিবহাল নয়- এই প্রশ্নের ব্যাপারে ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া বলেন, এটা কেন ঘটে, আর কী বা হতে পারে এই সমস্যার সমাধান? ওয়াকফা সম্পর্কে অনেকেরই সুষ্পষ্ট ধারণা নেই, ফলে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিবাদ তৈরি হয়। এটা জানা থাকা দরকার যে, পাবলিক প্রপার্টি এবং ওয়াকফা এস্টেটের জন্য দুটি ভিন্ন আইন রয়েছে। ওয়াকফা সম্পত্তি হচ্ছে আল্লাহ’র সম্পত্তি। এ কারণে সরকার কর্তৃক প্রণীত আলাদা আইনে ওয়াকফা এস্টেটগুলো পরিচালিত হচ্ছে। আইনে আছে বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগীরা ছাড়া কেউ মোতাওয়াল্লীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন তুললে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে অনেক জায়গায় বহিরাগতরা ব্যক্তিস্বার্থে ওয়াকফা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এমনকি মামলা মোকাদ্দমাও করছে। বেআইনি হবার পরও সেইসব অভিযোগ আমলে নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত পর্যন্ত করা হচ্ছে। ফলে ওয়াকফা এস্টেট পরিচালনায় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন মোতাওয়াল্লীরা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায়। অবিলম্বে বহিরাগতদের এসব কর্মকাণ্ড ও অনিয়ম বন্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
ইউনানী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষালাভের ব্যাপারে বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের আগ্রহ সম্পর্কে তিনি বলেন, এই খাত নিয়ে বিপুল আগ্রহ রয়েছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। শুধু প্রয়োজন খাত সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করা। ইউনানী-আয়ুর্বেদিক ওষুধের অভূতপূর্ব সম্ভাবনা এখন সারাবিশ্বে। বাংলাদেশেও এই খাতে সূচনা হয়েছে নতুন দিগন্তের। সরকারের ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিষয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ চিন্তা ও নির্দেশনাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাস্তবে রূপ দিতে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে ২০১২ সালে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করি। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, ইউজিসি এবং বাংলাদেশ বোর্ড অব ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক সিস্টেমস অব মেডিসিন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বসম্মতিক্রমে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিইউএমএস) এবং ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিএএমএস) প্রোগ্রাম দুটিকে আইনসম্মতভাবে অনুমোদন প্রদান করে। শুধু তাই নয়, প্রোগ্রাম দুটির সিলেবাস ও কোর্স কারিকুলামও ইউজিসি কর্তৃক অনুমোদিত। পাশাপাশি উক্ত অনুষদে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে তারা।
আরও বলেন, ব্যতিক্রমী বিষয় হলো- বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একমাত্র হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ই সরাসরি বিইউএমএস ও বিএএমএস প্রোগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশে ৩টি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মধ্যে একটি সরকারি। রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজটি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধিভুক্ত। অপর দুটি প্রতিষ্ঠান হামদর্দ পরিচালিত। লক্ষীপুরে অবস্থিত রওশন জাহান ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত এবং বগুড়ায় অবস্থিত হামদর্দ ইউনানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হিসেবে বিইউএমএস প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২০ প্রণয়নসহ এই বিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণকারী চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে শিক্ষার্থীরা আরও আগ্রহী হবে। এ বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে সরকারের আরও উদ্যোগ আশা করি।
হামদর্দ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্কের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করার গৌরব অর্জন করেছে। এই প্রক্রিয়া ক্রমেই সম্প্রসারিত ও জোরদার হচ্ছে। ইনডিজেনাস চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রণী দেশ হচ্ছে চীন। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাজের পরিধির বিষয়ে ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া জানান, যৌথভাবে ইউনানী আয়ুর্বেদিক ও হারবাল খাতের অগ্রগতির জন্য চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ ইতিমধ্যে সরকার হাতে নিয়েছে। তাছাড়া হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইউনানী-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা খাত আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ শিক্ষার আঙিনায় পা রেখেছে। অত্যাধুনিক ল্যাবের মাধ্যমে ইউনানী-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে নিরন্তর গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এখানে রয়েছে উচ্চতর এমপিএইচ ডিগ্রিও। হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিইউএমএস ও বিএএমএস প্রোগ্রাম দুটি প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির এমবিবিএস এর সমমান মর্যাদার। প্রোগ্রাম দুটি সম্পন্ন করলে বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি রয়েছে সরকারি চাকরির সুযোগ। হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ; ভারত, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্কের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছে। ইতিমধ্যে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ক্যাম্পাসে শ্রীলঙ্কা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ শিক্ষক পাঠদান করেছেন। ভারত সরকারও একজন ইউনানী বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদকে পাঠিয়েছে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ভারত ও অন্যান্য দেশে প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিষয়ক স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশে আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন- ভারতে আয়ুশ মন্ত্রণালয় আছে, তারা ইউনানী আয়ুর্বেদিক এবং হারবাল শিল্পের অগ্রগতি ও উন্নয়নে অসাধারণ কাজ করছে। বাংলাদেশেও আয়ুশের আদলে মন্ত্রণালয় করা গেলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হবে এ ওষুধ শিল্প খাতটির। পাশাপাশি যে সকল সমস্যা রয়েছে ইউনানী আয়ুর্বেদিক এবং হারবাল শিল্পে, সেগুলো দূর করে আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করা যাবে। এদেশের সাধারণ মানুষ স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের বর্তমান যে জাতীয় ঔষধনীতি, সেখানে ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ওষুধের স্বীকৃতি ও গুরুত্ব প্রদান করার বিষয়ে সোজাসাপ্টা জানান ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের ঘটনা। তখন হারবাল ওষুধ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃত ছিল না। আমি চেষ্টা শুরু করলাম। আমার স্বপ্নের কথা জানালাম জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম স্যারকে। এরপর বিষয়টি অবগত করলাম ওষুধ প্রশাসনের তৎকালীন পরিচালক ড. হুমায়ুনকে এম এ হাই সাহেব এবং সংশ্লিষ্টদেরকে। এ বিষয়ে তখন আন্তরিকতা দেখালেন ইউনানী আয়ুর্বেদিক বোর্ডের চেয়ারম্যান হাকীম আজিজুল ইসলাম। আমার লেগে থাকা এবং সবার আন্তরিকতার কারণে জাতীয় ওষুধ নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয় হারবাল ওষুধ। এর ফলে যুগান্তকারী পরিবর্তন শুরু হয় ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধ সেক্টরে। ১৯৯২ সালের দিকে, এই ওষুধ নীতি থেকে ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল খাতকে বাদ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আমরা হাইকোর্টে মামলা করি। সেই মামলার আইনজীবী হতে ড. কামাল হোসেন সাহেবকে অনুরোধ করি। তিনি রাজি হন। আমরা ওই মামলায় জিতে যাই, সরকার হেরে যায়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই খাতকে।
হামদর্দের যে নিজস্ব ঔষধি উদ্যান রয়েছে, সেখানকার গাছ-গাছড়া ও বিভিন্ন প্রজাতির বিষয়ে জানান তিনি, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে হামদর্দের আধুনিক কারখানা এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, হামদর্দের নিজস্ব ঔষুধি বাগান আছে এবং বগুড়া ও লক্ষ্মীপুরে হামদর্দ এর কলেজের হারবাল গার্ডেনে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য উদ্ভিদ রয়েছে। সবমিলিয়ে ২০০ প্রজাতির ঔষুধি উদ্ভিদ, লতা, গুল্ম, ফুল ও ফল রয়েছে, যেগুলো আমাদের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন অঞ্চল ও মার্কেট থেকে আমরা ভেষজ উপাদান সংগ্রহ করি। তবে সরকারের উদ্যোগে ভেষজ বাগান করা হলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মুদ্রা আর বিদেশে যাবে না এবং এই খাতের অগ্রগতিতে অসাধারণ কাজ হবে।
সম্প্রতি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ এর সফলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নাম, তিনি হলেন- অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র পরিচালক উন্নয়ন ও পরিকল্পনা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিশিষ্ট এই লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সেবক । তার দায়িত্ব গ্রহণে হামদর্দের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হবে বলে মনে করেন এর কর্মী ও সেবাগ্রহিতারা। তিনি আধুনিক হামদর্দের রূপকার, হামদর্দ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চীফ মোতাওয়াল্লী, কিংবদন্তী উদ্যোক্তা ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভুঁইয়া’র সহধর্মিনী। অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন দীর্ঘদিন থেকে নেপথ্যে থেকেই হামদর্দ ও এর সেবার মান উন্নয়নে এমডি ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভুঁইয়ার মাধ্যমে স্বীয় মেধা-মনন ও অভিজ্ঞতার আলোকে বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন।

তার সুষ্ঠু পরিকল্পনায় হামদর্দের পণ্যসমূহ অধিক উপকারী ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ের আগে থেকে হামদর্দের চালু থাকা তিনটি ওষুধ করোনার উপসর্গ মোকাবিলায় কাজ করার থিওরি তিনিই দিয়েছেন। যার কারণে সেই সময়ে বাংলাদেশের মানুষ ব্যাপক উপকৃত হয়েছে এবং একই সাথে হামদর্দ হয়ে উঠেছে আরও জনপ্রিয়। এছাড়া হামদর্দ ব্যবসায়ীক উন্নতি নিশ্চিত রেখেও এর কর্মীদের সুযোগ- সুবিধা বৃদ্ধির ফর্মূলাও তিনি দিয়েছেন। এভাবেই তিনি হামদর্দ পরিবারের একজন আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছেন। এই কারণে দীর্ঘদিন থেকেই তাকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদে যুক্ত করার দাবী চলে আসছে সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি বরাবরই এই দাবি উপক্ষো করে গেছেন। অবশেষে তীব্র দাবির মুখে হামদর্দের সিনিয়র পরিচালক উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় হামদর্দের সকল স্তরের কর্মীদের মাথায় নতুন স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে।
তাদের বিশ্বাস- অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এর হামদর্দের পরিচালনা পরিষদে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী বলেন, ড. হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভুঁইয়া’র ছোঁয়ায় হামদর্দ আজ দেশসেরা প্রতিষ্ঠান। তার সাথে অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এর ছোঁয়া যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে হামদর্দের এ উন্নয়ন যাত্রা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যাবে বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকায়। ইতিপূর্বে অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এর সম্পৃক্ততায় এর দুটি প্রতিষ্ঠান হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় ও রওশন জাহান ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যুক্ত হয়েছে অভাবনীয় সাফল্যের পালক। এছাড়া তিনি ব্যক্তিগতভাবে মানবিক ও সামাজিক কাজে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছেন। তাই শতভাগ মানবকল্যাণে নিবদিত প্রতিষ্ঠান হামদর্দের পরিচালনা পরিষদে তার যুক্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানবিক ও সামাজিক কাজে নিবেদিতরাও সন্তুষ্টি জানিয়েছেন।









