গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা চালায় গাজা উপত্যকার স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস, এতে মারা যায় ইসরায়েলের প্রায় ১২০০ বেসামরিক নাগরিক। এই হামলার জবাবে পাল্টা হামলায় প্রায় ২ মাস সময় ধরে গাজায় ব্যপক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফলাফলে অঞ্চলটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ যাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু। গাজা উপত্যকায় একটানা হামলা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে ইসরায়েলের রয়েছে অন্য কারণ।
ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজা ভূখণ্ডের মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে আছে হামাসের গোপন সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গ ধ্বংস করার জন্যই মূলত গাজা উপত্যকায় একের পর এক আক্রমণাত্মক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। গাজার বেসামরিক মানুষ তাদের লক্ষ্য নয়। হামাসের সবগুলো গোপন সুড়ঙ্গ ধ্বংস করলেই এই গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে এমন ধারণা থেকেই গাজায় একটানা সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েল। যুদ্ধ শুরুর পর ইতিমধ্যেই তারা হামাসের ১৫০টি গোপন সুড়ঙ্গ ধ্বংস করার দাবি করেছে। এছাড়াও সম্প্রতি গাজার আল শিফা হাসপাতালের নিচে হামাসের তৈরি দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাই আবারও নতুন করে কৌতূহলের জন্ম দিচ্ছে হামাসের এই সুড়ঙ্গ।

হামাসের এই সুড়ঙ্গের আকার সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া খুবই কঠিন। ইসরায়েল একে ‘গাজা মেট্রো’ বলেও উল্লেখ করে, কারণ এই সুড়ঙ্গগুলো গাজা উপত্যকার মাটির নীচে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, যুদ্ধ পরিচালনা ছাড়াও এইসব সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে হামাস ও অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী বাণিজ্যিক পণ্য, তেল এবং অস্ত্র চোরাচালান করে থাকে।
২০২১ সালের একটি সংঘাতের পর ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিমান হামলা করে হামাসের ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করার দাবি করে। জবাবে হামাস তখন বলেছিল, তাদের সুড়ঙ্গ ৫০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এর মাত্র পাঁচ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছে। হামাসের করা এই দাবির সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণার জন্য বলা যেতে পারে, পুরো লন্ডন শহরের আন্ডারগ্রাউন্ডের দৈর্ঘ্য ৪০০ কিলোমিটারের মতো। অর্থাৎ হামাসের দাবি অনুযায়ী তাদের সুড়ঙ্গের বিস্তার লন্ডন শহরের আন্ডারগ্রাউন্ডের চেয়েও প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেশি।

হামাস যখন মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করে, তখন সেই সুড়ঙ্গগুলো বেশ সাধারণ মানের ছিল। সেগুলো মাটির মাত্র কয়েক মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এখন তাদের আছে সর্বোচ্চ ২০ মিটার পর্যন্ত গভীর সুড়ঙ্গ। সেগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবনী প্রকৌশল প্রক্রিয়া ও কংক্রিটের মতো মজবুত সব উপকরণ।
এই সুড়ঙ্গগুলো অনেকটা দুর্গের মতো। হামাসের নেতারা সেখানে লুকিয়ে থেকে হামলা ও আনুষাঙ্গিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এর ভিতরে রয়েছে তাদের কমান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার। তারা এগুলো ব্যবহার করে ট্রান্সপোর্ট ও যোগাযোগের জন্য। এগুলোতে আলো এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে। রয়েছে রান্নাগর, টয়লেট এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। হামাসসহ গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সময়ে সুড়ঙ্গে তাদের সংগৃহীত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখে।যোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এই সুড়ঙ্গ। এমনকি সমরাস্ত্র তৈরির কারখানাও রয়েছে এসব টানেলে।

ধারণা করা হয়, গাজায় যে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০০ ফুট গভীরে এবং এর প্রবেশপথগুলো সাধারণ ঘরবাড়ি, মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল কিংবা এমন ভবনে যেখানে সাধারণ মানুষের সমাগম হয়। মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের যেন চিহ্নিত করা না যায় সেজন্য এগুলো ব্যবহার করে তারা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিচে অবস্থিত হওয়ায় এগুলো ধ্বংস করতে আলাদা অস্ত্রের প্রয়োজন। শক্তিশালী বোমা বা রকেটও কংক্রিটের তৈরি বস্তুতে আঘাত হানলে বিস্ফোরিত হয়ে যায়। ফলে, এইসব স্থাপনার কয়েকটি তলা ধ্বংস হলেও সুড়ঙ্গগুলোর কোন ক্ষতি হয় না। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের ব্যপক হামলা সত্ত্বেও হামাসের দুর্ভেদ্য এই সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের কারনে তাদের পরাজিত করা এত সহজ হবে না।
তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা হামাস বাহিনী ও তাদের সুড়ঙ্গ ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত রাখবে। অব্যাহত এই হামলার মানে আরও বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, শিশুদের চিৎকার। কবে থামবে এই মৃত্যুর মিছিল তারই অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।







