‘আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম’। সূরা বাকারার এই আয়াতে সুদ হারাম হওয়ার পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা হালাল থেকে হারাম আলাদা করে দিয়েছেন। অর্থাৎ, হালাল ও হারাম কখনো একত্রে চলতে পারে না। তেমনি ব্যবসার ক্ষেত্রেও হালাল ও হারামের বিভাজন রয়েছে।
মক্কাজীবনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ব্যবসা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ব্যবসায়ী। ব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহিত করেছেন। হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ, কোন উপার্জন উত্তম? জবাবে তিনি বললেন, ব্যক্তির নিজস্ব পরিশ্রমের উপার্জন এবং সৎ ব্যবসা থেকে উপার্জন (বুখারী শরীফ, ইফা, হাদিস নং ১৯৪২)। হাদিসে এসেছে, আমানতদার ও সত্যবাদী মুসলিম ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবেন (তিরমিজী শরীফ, ইফা, হাদিস নং ১২১২)
ব্যবসার ফজিলত সম্পর্কে এই হাদিসগুলোতে আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো দুইটি শর্ত দেওয়া হয়েছে, আমানতদারিতা ও সত্যবাদিতা। এই দুইটি গুণ হালাল ব্যবসার বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ ব্যবসা হালাল হলে ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন প্রতিশ্রুত ফজিলত পাবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, পবিত্র রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমানতদারিতা এবং সত্যবাদিতা কতটুকু বিদ্যমান? যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে অবশ্যই ব্যবসায়ী তার প্রাপ্য ফজিলত পাবেন। কিন্তু ব্যতিক্রম হলে রয়েছে শাস্তি।
কোনো ব্যবসায়ী যদি প্রতারণার আশ্রয় নেয়, ক্রেতার কাছ থেকে দ্রব্য সম্পর্কে কোনো জরুরী তথ্য গোপন করে তাহলে তা হবে হারাম। হজরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতারণামূলক ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেছেন (মুসলিম শরীফ, ইফা, হাদিস নং ৩৬৬৬)।
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেয়ামতের দিন তিন ধরণের মানুষের সাথে আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন না। তন্মধ্যে এক ধরণের মানুষ হচ্ছে, যারা মিথ্যা কসম করে দ্রব্য বিক্রি করার চেষ্টা করে (মুসলিম শরীফ, ইফা, হাদিস নং ১৯৫)। হজরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মিথ্যা কসম পণ্য বিক্রয়ে সহায়তা করলেও তা বরকত নষ্ট করে দেয় (বুখারী শরীফ, ইফা, হাদিস নং ১৯৫৭)।
আমাদের দেশে সবসময়ই বিশেষ করে রমজান মাসে পণ্য মজুদ করে দাম বাড়ানোর একটি অভিযোগ ব্যবসায়ীদের প্রতি জনসাধারণের থাকে। এ সম্পর্কেও রয়েছে কঠিন নির্দেশনা। ইবনে উমার রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাদ্য মজুদ করে রাখে সে ব্যক্তি আল্লাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত এবং আল্লাহও তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত (মিশকাত শরীফ, হাদিস নং ২৮৯৬)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমদানিকারী রিজিকপ্রাপ্ত হয় এবং গুদামজাতকারি অভিশপ্ত হয় (ইবনে মাজাহ, ইফা, হাদিস নং ২১৫৩)।
বর্তমান বাজারে বিভিন্ন ডিজিটাল মেশিনের কারসাজিতে ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ আছে। কিন্তু ইসলামে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কুরআন শরীফে একাধিক জায়গায় ওজনে কম দিতে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেছেন। সূরা বনী ইসরাইলে এসেছে, মাপার সময় সঠিক মাপ দিবে এবং ওজন দিবে সঠিক দাড়িপাল্লায়। এটিই উত্তম এবং উৎকৃষ্ট। সূরা আর রাহমানে এসেছে, তোমরা ইনসাফের সাথে ওজন করবে এবং তাতে কম দিবে না (৫৫:৯)। সূরা মুতাফফিফিনে আছে, দুর্ভাগা তারা, যারা ওজনে কম দেয়। তারা লোকদের থেকে মেপে নেওয়ার সময় ঠিকমতো মেপে নেয় কিন্তু লোকদেরকে মেপে দেওয়ার সময় মাপে কম দেয়। তারা কি ভেবে দেখে না যে, তাদেরকে মৃত্যুর পর কেয়ামতের দিন পুনরায় উঠানো হবে (৮৩:১-৫)।
অর্থাৎ, হালাল ব্যবসা করলে যেমন রয়েছে আল্লাহর তরফ থেকে অশেষ নেয়ামত তেমনি হারাম ব্যবসা করলে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির প্রতিশ্রুতি। রমজানের মতো মহাবরকতময় মাসেও যদি মুসলিম ব্যবসায়ীগণ যাবতীয় প্রতারণা থেকে নিজেকে হেফাজত করতে না পারেন তাহলে তা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে হারাম থেকে বিরত থেকে হালাল ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনের তওফিক দান করুন, আমিন।







