বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় ‘গুপ্ত’ শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষ করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সেমিনার, টক শো কিংবা নির্বাচন সামনে রেখে চলমান জনসভাগুলোর বক্তৃতায় ‘গুপ্ত’ যেন একধরনের রাজনৈতিক কিওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। যা অতীতে তেমনভাবে দেখা যায়নি।
রাজনীতিতে এই ‘গুপ্ত’ শব্দটির আবির্ভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিশ্চয়ই নানা ব্যাখ্যা হাজির করবেন। তবে এ লেখার উদ্দেশ্য বাংলা সাহিত্য ও সিনেমায় ‘গুপ্ত’ শব্দটির দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক যাত্রাপথটি খেয়াল করা।
বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে ‘গুপ্ত’ শুধু একটি শব্দ নয়; এটি বরাবরই রহস্য, কৌশল ও গোপনীয়তা রক্ষার শক্তিশালী মোটিফ। এমনকি ‘গুপ্ত’ একটি প্রচলিত পদবী হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও সংস্কৃতিতে উপস্থিত। কবি–সাহিত্যিক থেকে শুরু করে গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নামের সঙ্গেও যুক্ত এই পদবী।
‘গুপ্ত’ পদবীর উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত। কেউ বলেন, গুপ্ত বিদ্যায় পারদর্শিতার সঙ্গেই এর সম্পর্ক। কোথাও আবার বৈদ্য বা চিকিৎসক পেশার সঙ্গে ‘গুপ্ত’দের মিল খোঁজা হয়। আবার একটি মত অনুযায়ী, রাজকোষের জন্য ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ‘গুপ্ত’ বলা হতো।
যে কারণেই ‘গুপ্ত’ নামের উদ্ভব হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যে ‘গুপ্ত’ পদধারী বহু পাঠকপ্রিয় কবি সাহিত্যিকদের খোঁজে পাওয়া যাবে। বাংলা সাহিত্যে ‘গুপ্ত’ পদধারী লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম কবি ও সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২–১৮৫৯)। ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’ হিসেবে পরিচিত ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকদেরও গুরু হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁর হাত ধরেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রচিত হয়।
গোয়েন্দা সাহিত্যের কথায় এলে নীহাররঞ্জন গুপ্তের সৃষ্টি কিরীটী রায় চরিত্রটি আলাদা গুরুত্ব পায়। আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কিরীটী চরিত্র নির্মাণ করেন। এই চরিত্র ঘিরে পশ্চিম বাংলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া জগদীশ গুপ্ত, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ক্ষেত্র গুপ্ত কিংবা সমকালীন সাহিত্যিক সুনেত্রা গুপ্ত- সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
শুধু লেখকের নামেই নয়, বইয়ের শিরোনামেও ‘গুপ্ত’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ পাঠকদের জন্য লেখা থ্রিলার, রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গুপ্তধন’ গল্প থেকে শুরু করে ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘সূর্যনগরীর গুপ্তধন’, ‘ভূতুড়ে গুপ্তধন’—এমন অসংখ্য বই পাঠকদের কল্পনাজগৎ দখল করে আছে।
বাংলাদেশে থ্রিলার সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজে ‘গুপ্ত’ শব্দটির ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘গুপ্ত আততায়ী’, ‘গুপ্ত হত্যা’, ‘গুপ্ত সংকেত’, ‘গুপ্ত বিদ্যা’- এই শিরোনামগুলো পাঠকের মনে এখনো রহস্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
তবে ‘গুপ্ত’ শুধু থ্রিলারেই সীমাবদ্ধ নয়। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘গুপ্ত জীবন প্রকাশ্য মৃত্যু’-তে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ভিন্ন অর্থে- নিম্নবর্গের মানুষের নিভৃত সংগ্রাম, পরিচয় সংকট ও সামাজিক রূপান্তরের জটিলতা তুলে ধরতে।
সিনেমাতেও ‘গুপ্ত’ শব্দ ও ধারণা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’, ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’—এগুলো রহস্য ও রোমাঞ্চধর্মী ধারার পরিচিত নাম। পাশাপাশি ইয়িলাস কাঞ্চন ও মান্না অভিনীত যথাক্রমে ‘গুপ্ত ঘাতক’, ‘গুপ্ত খেলোয়াড়’-এর মতো রাজনৈতিক থ্রিলারেও শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত রণ রাজ পরিচালিত ‘পরিচয় গুপ্ত’ সিনেমাটিও গোয়েন্দা থ্রিলার ধারার একটি নতুন সংযোজন।
তবে চলচ্চিত্রে ‘গুপ্ত’ কৌশলের সবচেয়ে শৈল্পিক রূপ সম্ভবত সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজেই দেখা যায়। ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ কিংবা ‘বাদশাহী আংটি’- এই ছবিগুলোতে ছদ্মপরিচয়, ভান, লুকিয়ে থাকা সত্য ও ধাঁধার ভেতর দিয়ে গল্প এগোয়। অপরাধীরা খুব কমই প্রকাশ্যে আসে; তাদের অস্তিত্বই যেন ‘গুপ্ত’।
দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রাপথের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ‘গুপ্ত’ শব্দটি কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়। এটি বাংলা সাহিত্য, সিনেমায় বহুদিন ধরেই রহস্য, ক্ষমতা ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।









