বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও দৃঢ় অবস্থানে নিতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট শিল্প-উদ্যোক্তা, ভাসাবি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামাল জামান মোল্লা।
বাংলাদেশ ভারত অর্থনীতি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভবনা নিয়েও কথা বলেছেন এই বিএনপি নেতা কামাল জামান মোল্লা। বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশের ব্যাংকিং. বাণিজ্য, সম্ভাবনা এবং সঙ্কট। বিশ্লেষণ করেছেন ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে।
বিএনপি নেতা কামাল জামান মোল্লা বলেন, ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিম দেশ। সাময়িক কিছুটা সমস্যা হলেও সেটা খুব সহসাই ঠিক হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। আমাদের যেমন ভারতকে প্রয়োজন ভারতেরও কিন্তু আমাদের প্রয়োজন। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বলে কারো সাথে শত্রুতা নয় সকলের সাথে বন্ধুত্ব। আমরা ব্যবসায়িক সমাজ সে নীতিতেই থাকতে চাই। তবে কিছু বিষয়ে আমাদের বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আজকে আমাদের দেশে জল ও স্থলপথে ১ কোটি ৭১ লক্ষ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হচ্ছে। যার মধ্যে ভারত থেকে আসছে ১ কোটি ৫০ লাখ টন। অর্থাৎ ৯৮ ভাগ পণ্যই আসছে ভারত থেকে। এখানে বাংলাদেশের সাথে ভারতই বিনিফিটেড হচ্ছে। বাংলাদেশ কিন্তু এতে বেনিফিটেড হচ্ছে না। আমি মনে করি ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে বৈরীতা সৃষ্টি হলে আমাদের অন্য দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে মালদ্বিপের সাথে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের জাহাজও বাংলাদেশে আসছে। ইতিপূর্বে ভারত বাংলাদেশে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সম্পর্ক তৈরি করেছিলো। দেশের সাথে নয়। এর ফলে সম্পর্কের অবনতিও হয়েছে। তবে আমি মনে করি ব্যক্তির সাথে নয়, দেশের সাথে, দেশের মানুষের সাথে ভারতের সম্পর্ক রাখা উচিত ছিলো। ভারত সরকার সেটা ভুল করেছে। আমি আশা করবো ভারত সরকার বর্তমান সরকারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে দু-দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, বিগত সরকার এরই মধ্যে দেশকে একটি অস্থির পরিস্থিতিতে ফেলে গেছে। ব্যাংকগুলো খালি হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো ফাঁকা করে ফেলেছে। বর্তমান সরকার পুরো বিষয়টিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর পরিকল্পনা করেছে। এ অবস্থায় ভারত যদি আমাদের প্রতিকূলতায় ফেলতে চায় সে ক্ষেত্রে আসরা ঘুরে দাঁড়াবো। বিগত কয়েক মাসে আমাদের রেমিটেন্স আসছে ২ বিলিয়ন ডলারের মতো।

কামাল জামান মোল্লা বলেন, গার্মেন্ট সেক্টরে আসছে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। আমরা ঘুরে দাঁড়াতে হয়তো সময় লাগবে ৬ মাস, ১ বছর। বাংলাদেশ কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়াবে, নিজস্ব অর্থায়নে দাঁড়াবে। কেবল মাত্র বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার না হলে। বর্তমান সরকার যদি সুষ্ঠুভাবে ব্যাংকগুলোতে শক্তিশালী করে, পুঁজিবাজারকে যদি শক্ত হাতে নেয়। বিগত সরকার যেমন পুঁজিবাজারকে তলানিতে নিয়ে গেছে। এই সেক্টরগুলো মজবুত করতে পারলে সামনের দিনে বাংলাদেশ কোন রকম সহায়তা ছাড়াই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, বিগত সরকার দেশের অর্থনীতি কে মুক্তবাজার থেকে গোষ্ঠীতান্ত্রিক করে ফেলেছিল। পরিবারের কিছু লোক এবং কিছু ব্যবসায়ী যার সুফল পায়। সাধারণ ব্যবসায়ীরা পথে বসে ছিল। আমি আমার নিজের কয়েকটি গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে এখন যারা গার্মেন্টস কে অস্থিতিশীল করছে তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। এক্সপোর্ট প্রমোশন বুড়োর ইপিবির তথ্যের দিকে তাকালে দিকে তাকালে দেখবেন গত দু মাসে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে। তাহলে কেন অস্থিরতা বাড়বে? এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। ব্যবসা করবে ব্যবসায়ীরা, গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি যার কোন ব্যবসা নেই তারাই ট্রেড বডিগুলোর প্রধান হয়ে বসে ছিল। ফলে তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ী সমাজ ভালো কিছু পাবে না এটাই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, একটা বিষয় আপনার খেয়াল করবেন বাংলাদেশের অনীতি পুরোপুরি ব্যাংক নির্ভর। যা বিশ্বের কোথাও নেই। পুঁজিবাজার হতে পারতো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু তা আমরা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আশা করি পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর স্থলপথে দু’ দেশের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টন পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি হয় ১ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬৩ টন পণ্য। এ সময় বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩৮ টন পণ্য। অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশই ভারতের অনুকূলে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানের নামে হাসিনা সরকার দেশি-বিদেশি বেসরকারি মালিকানাভিত্তিক ও বিদেশি ঋণনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও আমদানি নির্ভর জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে যেন কোনো জবাবদিহি করতে না হয়, সেজন্য রীতিমতো আইন করে আদালতে বিচার চাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত রহিত করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ-এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ-পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যে এতদিন যেসব সুবিধা পেয়ে আসছে, সেগুলো অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে। এতে দেশের রপ্তানি খাত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমার মতে, সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনা জরুরি। একই সাথে আমি বলবো, দীর্ঘ অনেক আন্দোলন সংগ্রামের ফসল আজকের এই নতুন বাংলাদেশ। আর এই নতুন বাংলাদেশের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প কিছু হতে পারে না।
তিনি বলেন, নির্বাচনে কে জয়ী হবে সে বিষয়টি মুখ্য নয়। তবে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বাণিজ্য উপদেষ্টা একজন জাত ব্যবসায়ী বলতে যা বোঝায় তিনি তা। সদিচ্ছা থাকলে তিনি অবশ্যই ভালো করবেন বলে আমার বিশ্বাস। আমার পরামর্শ মোটা দাগে প্রথম তাকে দ্রব্যমূলক নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। সিন্ডিকেট যত বড় শক্তিশালী হোক ভাঙতে হবে। তা না হলে কোন অর্জনই সম্ভব নয়। এবং বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক সেক্টরে শক্তিশালী ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে আঞ্চলিক ভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা নতুন শক্তি হিসেবে পরিচয় দিতে পারবো। আমাদের অন্যকারো প্রতি মুখাপেক্ষি থাকতে হবে না।









