বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। ব্যাংকিং শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ—এসবের মধ্যে সঠিক সমন্বয় না থাকলে খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় হোসেন খালেদ, সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, আধুনিক ব্যাংকিং, কর্পোরেট গভর্নেন্স এবং টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
হোসেন খালেদ কেবল একজন ব্যাংকার নয়, বরং তিনি দেশের কর্পোরেট সেক্টরের অন্যতম আধুনিক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে সিটি ব্যাংক কেবল আর্থিক লেনদেনের একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি উদ্ভাবনী, ডিজিটাল-নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম, যা দেশে ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে নতুন ধারা সৃষ্টি করছে। তার শৈশবকাল থেকেই ব্যবসার জটিলতা এবং ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় তাকে একটি স্বতঃসিদ্ধ ব্যবসায়িক মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা—ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্সে এমবিএ—তিনি আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান অর্জন করে দেশে তা প্রয়োগের প্রস্তুতি নেন।
সিটি ব্যাংকে দীর্ঘদিন পরিচালক এবং ভাইস চেয়ারম্যান থাকার পর এখন তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতের মান উন্নত করা। উদাহরণস্বরূপ, বিকাশের সঙ্গে অংশীদার হয়ে প্রথমবারের মতো কাগজপত্রবিহীন ডিজিটাল ঋণ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ১৪ লাখেরও বেশি গ্রাহক দ্রুত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পেরেছেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সুশাসন কেবল ব্যবসার সুবিধা নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করার শক্তিশালী হাতিয়ার।
সিটি ব্যাংকের বোর্ড কাঠামোও তার নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে। এখানে শুধু পারিবারিক প্রতিনিধি নয়, অভিজ্ঞ স্বতন্ত্র পরিচালক এবং বিশ্ব ব্যাংক গোষ্ঠীর সদস্য ও বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার আইএফসি-এর মতো আন্তর্জাতিক অংশীদার রয়েছে। এই কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সিটি ব্যাংককে দেশের সেরা টেকসই ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা তার দূরদর্শিতা ও সুশাসনের ফলস্বরূপ। হোসেন খালেদের মতে, সুশাসন কেবল নিয়ম মানার বিষয় নয়; এটি হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
ব্যাংকিংয়ের বাইরেও হোসেন খালেদ দেশের ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছেন। বিজিএমইএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিএমএমইএ-এর সভাপতির ভূমিকায় থাকাকালেও তিনি কর্পোরেট নীতি ও শিল্পখাতের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। পারিবারিক হোসেন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজকে তিনি আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ফার্নিচার ব্র্যান্ড ‘ইশো’, রিয়েল এস্টেট, বিনোদন পার্ক এবং জ্বালানি খাত। এই অভিজ্ঞতা তাকে একাধারে ব্যাংকার, শিল্পনেতা এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনী নিয়ে তিনি সরব হয়েছেন। কর্পোরেট গভর্নেন্স শক্তিশালী করার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বোর্ডে পারিবারিক অংশগ্রহণ সীমিত করার প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, পারিবারিক অংশগ্রহণ দুর্বলতা নয়; বরং এটি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে সহায়ক। ভারতের এবং সিঙ্গাপুরের মতো বাজারে এর সফল উদাহরণ রয়েছে। তিনি বলেন, সংখ্যা দিয়ে সীমা নির্ধারণের চেয়ে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা সুশাসনের প্রকৃত ভিত্তি।
সিটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কৌশল এবং কর্পোরেট গভর্নেন্স কাঠামো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বোর্ডে পারিবারিক প্রতিনিধি, অভিজ্ঞ স্বতন্ত্র পরিচালক এবং আইএফসি-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যে আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে। আইএফসি-এর কৌশলগত অংশীদারিত্ব সিটি ব্যাংককে বৈশ্বিক তদারকি, অভিজ্ঞতা এবং পুঁজি আনতে সাহায্য করেছে। এই ধরনের সুশাসনের কারণে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সিটি ব্যাংককে দেশের সেরা টেকসই ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। হোসেন খালেদ মনে করেন, সুশাসন কেবল ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজন নয়; এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
হোসেন খালেদ নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং আস্থার সংকটের বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনীকে স্বাগত জানালেও বোর্ড কাঠামো, শেয়ারহোল্ডিং এবং পরিচালকদের মেয়াদকালে পারিবারিক অংশগ্রহণ সীমিত করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তার মতে, এই ধরনের সীমা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বিপন্ন করতে পারে এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংক মালিকানা বা প্রশাসনে পারিবারিক সম্পৃক্ততা কোনো দুর্বলতা নয়। যদি এটি স্বচ্ছভাবে এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে থাকে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে অনেক ব্যাংক শক্তিশালী সুশাসন বজায় রেখে পারিবারিক নেতৃত্বে উন্নতি লাভ করেছে। ভারত এবং সিঙ্গাপুরে এর সফল উদাহরণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, বোর্ডে পারিবারিক প্রতিনিধিত্ব তিন জন থেকে কমিয়ে দুই জন করার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
নিয়ন্ত্রক সংস্কারে তিনি আরও বলেন, সংখ্যা নির্ধারণের চেয়ে স্বাধীনতা, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহিতা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রকৃত সুশাসনের জন্য সমস্যা পরিবার নয়, সমস্যা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করেন, যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করে যা সংখ্যাগত সীমার চেয়ে স্বাধীনতা, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেয়।
সিটি ব্যাংক কেবল বোর্ড কাঠামোর মাধ্যমে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলন চালু করেছে। স্বতন্ত্র পরিচালকদের কঠোর স্বাধীনতা, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ লেনদেন, সুশাসন নিশ্চিত করছে। তাদের আনুষ্ঠানিক বোর্ড মূল্যায়ন কাঠামো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং এটি ইতোমধ্যেই ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি সিটি ব্যাংককে দেশের সেরা টেকসই ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা শক্তিশালী সুশাসন এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতিফলন।
হোসেন খালেদ দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে রিপোর্ট অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪.২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে ৪০%-এরও বেশি। এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে ‘এভারগ্রিনিং’, শিথিল পুনঃতফসিল এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর এনপিএল নির্দেশিকা আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে এবং আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীদের আশ্বস্ত করে।
তবে, তিনি সতর্ক করেছেন যে, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে এসএমই এখনও মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা থেকে পুনরুদ্ধার করছে। তাই কঠোরতা একবারে প্রয়োগ করলে সম্ভাবনাময় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হতে পারে। তিনি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের (gradual transition) পরামর্শ দেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রকরা কঠোরতা প্রয়োগ করতে পারবে, তবে ব্যবসায়ীদের সময়ও দেবে।
হোসেন খালেদ অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংকিং শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রকদের নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। ব্যাংক রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ অনুযায়ী, ব্যর্থ ব্যাংকে হস্তক্ষেপ, একত্রীকরণ বা বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে, যা দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োগ করা উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংক বোর্ডগুলোতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে যোগ্য পেশাদারদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। ঋণ সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শক্তিশালী, স্বাধীন অডিট ও ঝুঁকি কমিটি অপরিহার্য।
ঋণ সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সহজ পুনঃতফসিল খেলাপি ঋণের সমস্যাকে জোরদার করেছে। কঠোর একক-ঋণগ্রহিতা সীমা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক মান অনুসারে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং করতে হবে। জালিয়াতি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি মোকাবেলায় দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সিটি ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অত্যন্ত উদ্ভাবনী। সিটি ব্যাংক একটি ব্যাংক থেকে একটি সম্পূর্ণ আর্থিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হবার পথে হাঁটছে। বিকাশের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ডিজিটাল ঋণ, অ্যাপভিত্তিক ১৪ লক্ষাধিক গ্রাহক, ‘পে-লেটার’, ট্যাপ-অ্যান্ড-পে, কিউআর এবং কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, তাদের ডিজিটাল নেতৃত্বের প্রমাণ। আমেরিকান এক্সপ্রেসের একমাত্র অংশীদার হিসেবে তারা দেশের প্রথম অ্যামেক্স মেটাল কার্ড চালু করেছে।
সিটি ব্যাংক ভবিষ্যতে এআই-নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল রূপান্তর, ইউএই ফিনটেকের সঙ্গে অংশীদারিত্ব, ৮০০ কোটি বন্ড ইস্যু, ব্যানকাশিওরেন্স এবং ফি-ভিত্তিক পরিষেবা বৃদ্ধি এবং টেকসই প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে চায়। বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও তারা উৎসাহিত করছে, যা খাতের পুনর্গঠন, আস্থা পুনরুদ্ধার এবং মূলধন বাড়াতে সহায়ক।
হোসেন খালেদ বর্তমান সংস্কারকে অপরিহার্য মনে করেন। কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ, শৃঙ্খলা ও সুশাসনের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। সংস্কার ঘোষণা করা সহজ; এটি প্রয়োগ, স্বার্থান্বেষী প্রতিরোধ মোকাবেলা ও ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
হোসেন খালেদ অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংকিং শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। যার মধ্যে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রকদের নতুন ক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার করতে হবে, ব্যর্থ ব্যাংকে হস্তক্ষেপ, একত্রীকরণ বা বন্ধ করার ক্ষমতা কার্যকর করতে হবে। ব্যাংক বোর্ডে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে যোগ্য পেশাদারদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ঋণ সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী, স্বাধীন অডিট ও ঝুঁকি কমিটি অপরিহার্য।
সিটি ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাংককে একটি প্ল্যাটফর্ম-চালিত আর্থিক ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করা। লক্ষ্য হলো মানুষ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এসএমই বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধনের ব্যাংক গড়ে তোলা।
তিনটি প্রধান কৌশলে সিটি ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংক থেকে আলাদা। প্রথমত, বিকাশের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ডিজিটাল ঋণ চালু করা। ইতোমধ্যে ১৪ লাখের বেশি গ্রাহক ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন। কোনো শাখা বা কাগজপত্রের প্রয়োজন নেই। তারা ‘পে-লেটার’, ট্যাপ-অ্যান্ড-পে, কিউআর ও কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্টে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের মোট এসএমই ঋণের অর্ধেক ডিজিটালভাবে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
দ্বিতীয়, সিটি ব্যাংক আমেরিকান এক্সপ্রেসের একমাত্র অংশীদার হিসেবে রয়েছে এবং প্রথম অ্যামেক্স মেটাল কার্ড চালু করেছে। এটি প্রিমিয়াম ব্যাংকিংয়ে নেতৃত্বকে জোরদার করে। তৃতীয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সিটিটাচের মাধ্যমে খুচরা ও এসএমই-তে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালে সিটি ব্যাংককে দেশের এক নম্বর টেকসই ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আইএফসি বোর্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক সুশাসন এবং জবাবদিহিতা বজায় থাকে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএই ফিনটেকের সঙ্গে অংশীদারিত্বে সিটিটাচ প্ল্যাটফর্মে এআই-নির্ভর রূপান্তর শুরু হয়েছে। ৮০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু এবং ব্যানকাশিওরেন্স ও ফি-ভিত্তিক পরিষেবা আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আইএফসি-এর ৫০ মিলিয়ন বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের ছোট ব্যবসায় অর্থায়ন বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারীর আগমনকে হোসেন খালেদ ইতিবাচকভাবে দেখেন। স্বচ্ছতা, ন্যায্য মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক শক্তি এবং উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় এটি সফল করতে পারে। সিটি ব্যাংকের আইএফসি অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশি অংশীদাররা মূলধন, জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আসে।
বর্তমান সংস্কারের উদ্যোগগুলো হোসেন খালেদ বেদনাদায়ক হলেও প্রয়োজনীয় মনে করেন। যদিও আইএমএফ এর তথ্য অনুসারে পুরো ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, তবুও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সমর্থন করছেন এবং জনআস্থা ফিরছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসল পরীক্ষা হলো বাস্তবায়ন। সংস্কার ঘোষণা করা সহজ, তা কার্যকর করা কঠিন। তবে যদি দৃঢ়ভাবে ও ন্যায্যভাবে কার্যকর হয়, তবে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সম্ভাবনা পূর্ণ হবে। শক্তিশালী কর্পোরেট গভর্নেন্স ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ঋণ সংস্কৃতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
হোসেন খালেদ বিশ্বাস করেন, সিটি ব্যাংকের পথ হলো সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। শক্তিশালী বোর্ড কাঠামো, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং ধীরে ধীরে এনপিএল সংস্কারের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করা সম্ভব।
হোসেন খালেদ এবং সিটি ব্যাংকের উদ্ভাবনী, সুশাসন-ভিত্তিক নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে যে ব্যাংকিং খাতে সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে কেবল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, বরং এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দেয়। শক্তিশালী কর্পোরেট গভর্নেন্স, শৃঙ্খলাবদ্ধ ঋণ সংস্কৃতি, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের অংশীদারিত্ব—এসব মিলিয়ে সিটি ব্যাংক একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে যা ভবিষ্যতের ব্যাংকিংকে নতুন মানদণ্ডে পৌঁছে দেবে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব









