রাজধানীর আফতাবনগরে একটি কুকুর হত্যার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন রোমানা আফরোজ এক ভুক্তভোগী। কুকুরটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠিয়েছে পুলিশ। অভিযোগকারীর দাবি, এলাকার নিরাপত্তা কর্মীরা কুকুরটিকে হত্যা করেছে।
প্রাণীপ্রেমী সংগঠনগুলো বলছে, পশু পাখির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং মানবিক আচরণ দেখানো আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও অধিক নজরদারির প্রয়োজন।
রাজধানীর বাড্ডা থানায় সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) রোমানা অভিযোগ করেন, তিনি এলাকার ১০টি কুকুরের দেখাশোনা করেন, নিয়মিত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন ও খাওয়ান। কিন্তু এলাকার কিছু নিরাপত্তারক্ষী কোনো কারণ ছাড়া প্রায়ই কুকুরগুলোকে লাঠি দিয়ে মারেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে নিরাপত্তারক্ষীরা কুকুরের ক্ষতি করা হবে বলে তাকে হুমকি দেন। বুধবার সকাল ৭টার দিকে রোমানা কুকুরগুলোকে খাওয়াতে গেলে তাদের মধ্যে একটিকে খুঁজে পাননি।
এলাকার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার কয়েক ঘণ্টা পর কুকুরটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কুকুরটিকে হত্যা করা হয়েছে।
রোমানা বলেন, আমি তখন নিরাপত্তারক্ষীদের কুকুরটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তারা প্রথমে কিছু জানার কথা স্বীকার করছিলেন না। পরে তারা জানান, কুকুরটি ট্রাকচাপায় মারা গেছে। খোঁজাখুঁজির পর আমরা এলাকার এম ব্লকের পেছনে কুকুরটির মরদেহ দেখতে পাই। কুকুরটির শরীরে তেমন কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। গলায় বেল্টও ছিল না।
জানতে চাইলে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াসিন গাজী বলেন, কুকি নামের কুকুর হত্যা সন্দেহে গতকাল বুধবার (৬ ডিসেম্বর) রোমানা আফরোজ একটি জিডি করেন। তিনি কুকুরটির দেখাশোনা করতেন। জিডির পরিপেক্ষিতে কুকুরটির মরদেহ কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ময়নাতদন্ত শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেলে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রাণীপ্রেমী সংগঠন পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ারের (প ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্থপতি রাকিবুল হক এমিল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে ২০১৯ সালে নতুন আইন করেছে সরকার। যদিও আইনটির প্রয়োগ কম। ভুক্তভোগীরা থানায় জিডি করলেও সেখান থেকে সঠিক বিচার পাওয়া যায় না। নতুন আইনের ১৮ ধারায় বলা আছে, কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ব্যতিত, কোন আদালত এই আইনের অধীন কৃত কোন অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবেন না। এই ধারাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কারণ স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এই লিখিত অভিযোগ দেয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও অধিক নজরদারির প্রয়োজন।
তিনি বলেন: আমাদের সমাজে পশু-পাখির প্রতি সবচেয়ে বেশি সহিংসতা দেখায়। এদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং মানবিক আচরণ দেখানো আমাদের সবার দায়িত্ব।
যা আছে আইনে
প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ এ বলা আছে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রাণীকে ওষুধ অথবা বিষ মেশানো খাবার খাওয়ান বা বিষ প্রাণীর দেহে প্রয়োগ করেন, এ ধরনের কাজ করার চেষ্টা করেন বা করতে সহায়তা করেন এবং এতে প্রাণীর মৃত্যু বা স্থায়ী অঙ্গহানি অথবা স্বাভাবিক আকার ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়, তাহলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ আইনে সাজা হিসেবে অনধিক ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার কথা বলা আছে। সর্বোচ্চ সাজা অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য। উল্লেখ্য, অ-আমলযোগ্য অপরাধ বলতে সেসব অপরাধকে বোঝায়, যা সংঘটিত হওয়ার পর আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্ত করতে হয়। বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না।
এদিকে প্রাণিকল্যাণ আইনে বলা আছে, এ আইনের অধীন অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতেও (মোবাইল কোর্ট) হবে। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের আওতায় আইনটি এখনো তফসিলভুক্ত হয়নি।
এরআগে ২০১৮ সালের ১০ মে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুকুর হত্যার দায়ে কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। রাজধানীর রামপুরায় দুই মাসহ ১৪ কুকুর ছানাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে হত্যার দায়ে সিদ্দিক নামের এক যুবককে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত।
প্রথমবারের মতো এই প্রাণী হত্যার মামলার আইনজীবী ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ ফোরকান। মামলার বাদী ছিলে পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারের (প ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম এমিল।
এর আগেও প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। কিন্তু সেসব মামলায় শুধু অর্থদণ্ডের মাধ্যমে পার পেয়ে যান আসামিরা।







