গাজার দক্ষিণাঞ্চলের বাস্তুচ্যুতদের জন্য তৈরি অস্থায়ী শিবিরে ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকায় না শিশুরা। তারা যেন নিজের চোখে সব দেখে নিয়েছে—মৃত্যু, মৃত্যুর প্রতীক্ষা আর ক্ষুধায় জর্জরিত জীবন। ক্যামেরার সামনে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের অনেক দিনের।
আজ ২৬ মে সোমবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, গাজার হাসপাতাল, শিবির আর ধ্বংসস্তূপে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংবাদিক বা আলোকচিত্রী কাজ করছেন। এমন এক সাংবাদিক বিবিসির জন্য নিয়মিত কাজ করেন; তার নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, শিশুদের এই দুরবস্থা প্রতিনিয়ত চোখের সামনে দেখতে দেখতে তার মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত। রোজ শুনতে হয় কান্না, দেখতে হয় ক্ষুধায় নিস্তেজ হয়ে পড়া শিশুদের, কখনোবা কাফনে মোড়ানো মৃতদেহ।
সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোকচিত্রী খোঁজ করছিলেন একটি শিশুর—সেওয়ার আশৌর, বয়স মাত্র পাঁচ মাস। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের আঙ্গিনায় তার কান্না হৃদয় ভেঙে দেয়। ফুটেজ ধারণ করতে গিয়ে তিনি মেয়েটিকে দেখেছিলেন—যার ওজন তখন ছিলো মাত্র দুই কেজির কিছু বেশি, অথচ তার বয়স অনুযায়ী ছয় কেজি হওয়া উচিত। খবর পান, শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সে এখন বাসায়। তাই তিনি ছুটে যান তাদের শরণার্থী শিবিরের অস্থায়ী ঘরে। সেখানেই খুঁজে পান সেওয়ারকে, তার মা নাজওয়া (২৩) এবং নানী রিমের সঙ্গে।

নাজওয়া জানান, সাধারণ গুঁড়ো দুধ সেওয়ারের শরীরে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যুদ্ধ এবং অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় শিশুখাদ্য পাওয়া যাচ্ছে না। নাসের হাসপাতালে এক পর্যায়ে তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এখন ওজন আবার কমে যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে মাত্র এক ক্যান দুধ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, সেটিও প্রায় শেষ। তিনি বলেন, সেওয়ার আগের চেয়ে ভালো, তবে আমি মনে করি তার যথেষ্ট উন্নতি হয়নি। মশা-মাছির উপদ্রব এতটাই বেশি যে মেয়ের মুখ স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় যেন কিছু না ছোঁয়।
নভেম্বরে জন্ম নেওয়া সেওয়ার জন্ম থেকেই যুদ্ধের আওয়াজে বড় হচ্ছে। গুলির শব্দ, ড্রোনের গুমগুম আওয়াজ, ট্যাংক আর রকেটের বিকট বিস্ফোরণ তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এসব শব্দে সেওয়ার চমকে উঠে, কাঁদতে থাকে, ঘুম ভেঙে যায়।নাজওয়া নিজেও ভুগছেন অপুষ্টিতে। গর্ভাবস্থায়ও ঠিকমতো খেতে পারেননি। সীমান্ত বন্ধ, মূল্যবৃদ্ধি, এবং অবরোধের কারণে খাবার, দুধ ও ডায়াপার সংগ্রহ ছিল দুরূহ। তার মা বলেন, আমরা কিছুই কিনতে পারতাম না, দুধ তো দূরের কথা।

এই বাস্তবতার মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট দাবি করেছে, গাজায় কোনো খাদ্য সংকট নেই। তারা জানিয়েছে, শিশু খাদ্য ও ময়দা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গাজায় পাঠানো হয়েছে। তবে সংস্থাটি হামাসের বিরুদ্ধে ত্রাণ চুরির অভিযোগও এনেছে।
তবে এই দাবি আন্তর্জাতিক মহলে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ কোগাটের বক্তব্যকে অবাস্তব আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েল যে সহায়তা ঢুকতে দিচ্ছে, তা ‘চা চামচের’ মতো অপ্রতুল। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, তেল ও চিকিৎসাসেবা ঘাটতিতে ফিলিস্তিনিরা এখন চূড়ান্ত মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, গাজার ৮০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে হয় ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণে অথবা সেখান থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে যুদ্ধের ১৯ মাস অতিক্রম করেছে। নানা সময়ে আন্তর্জাতিক নিন্দা, উদ্বেগ, প্রতিবাদ উঠে এসেছে, কিন্তু পরিবর্তন হয়নি গাজার বাস্তবতা। সেই পুরনো ছবিই রয়ে গেছে—নাজওয়া ও সেওয়ারের মতো লাখো মানুষ জীবন রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
‘কেউ ভবিষ্যৎ কিংবা অতীত নিয়ে ভাবে না,’ বলেন নাজওয়া, ‘সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আজ কীভাবে বাঁচবো?’









