রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সক্রিয় বেশকিছু কিশোর গ্যাং। তারমধ্যে জুলফিকারের নেতৃত্বে এবং অপর আসামীদের সহযোগিতায় ‘ডায়মন্ড’ ও ‘দে ধাক্কা’ নামে দুটি কিশোর গ্যাং পরিচালিত হতো।
এলাকার বেশকিছু বেপরোয়া ও মাদকসেবী কিশোরদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কিশোর গ্যাং পরিচালনার মাধ্যমে এলাকায় অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতি ও ভূমি দখলসহ বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকে। জুলফিকারের কিশোর গ্যাং পরিচালনা করার জন্য হারুন, শামছুদ্দিন বেপারী, কৃষ্ণ চন্দ্র দাস এবং সুরুজ মিয়া সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘ডায়মন্ড’ এবং ‘দে ধাক্কা’ কিশোর গ্যাং পরিচালনাকারী চক্রের অন্যতম হোতা জুলফিকার আলীসহ ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। শুক্রবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে আদাবর থানাধীন মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩ । এসময় তাদের কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন, জুলফিকার আলীর সহযোগী হারুন অর রশিদ, শামছুদ্দিন বেপারী (৪৮), কৃষ্ণ চন্দ্র দাস (২৮), ও সুরুজ মিয়া (৩৯)।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, র্যাব-৩ এর একটি দল গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, মোহাম্মদপুর এলাকায় কতিপয় কিশোরগ্যাং সদস্য দীর্ঘদিন যাবৎ মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন, এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং বিভিন্ন রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই
‘ডায়মন্ড’ এবং ‘দে ধাক্কা’ দুটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে রিকশা, ভ্যান, সিএনজি ও বাস যাত্রীদের টার্গেট করে তাদের ব্যাগ/পার্টস, মোবাইল ছিনতাই করে থাকে। দুটি কিশোরগ্যাংয়ের তৎপরতায় প্রতিনিয়ত তারা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে বিরোধী অন্যান্য গ্যাংসমূহের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তো।
খুবই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় বিভিন্ন ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করত। এসব ঘটনায় তারা হরহামেশাই যে কাউকে গুলিবিদ্ধ, কুপিয়ে জখম, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধাবোধ করে না।
টিউবওয়েলের মিস্ত্রী জুলফিকার যেভাবে কিশোর গ্যাং পরিচালনাকারী
জুলফিকার মূলত ‘ডায়মন্ড’ এবং ‘দে ধাক্কা’ গ্রুপের কিশোর গ্যাংদের কাছে দেশি-বিদেশি পিস্তল ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। আধিপত্য বিস্তারের জন্য কিশোর গ্যাংকে অস্ত্র সরবরাহ করে তাদের দ্বারা দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেলের মহড়া দিয়ে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন: অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা জুলফিকার এলাকায় একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতো। কিছুদিন ওয়ার্কশপে কাজ করার পর সে নারায়ণগঞ্জে এসে পিকআপে হেলপারি শুরু করে। হেলপারি করা অবস্থায় একটি স্বনামধন্য কোম্পানির মালামাল আত্মসাৎ করার দায়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে ১টি মামলা হয়। মামলার পর সে পালিয়ে সৌদি চলে যায়। ২০২১ সালে দেশে আসার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে সে ২ মাস জেল খেটে জামিনে মুক্ত হয়। জেলে থাকা অবস্থায় অপর আসামি হারুনের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠে।
জুলফিকার জামিনে মুক্ত হয়ে হারুনের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চলে আসে এবং প্রথমে এই এলাকায় টিউবওয়েলর মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। সে সময়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় মাদক সেবনের আড্ডার মাধ্যমে গ্রেপ্তার কৃষ্ণ, শামছুদ্দিন ও সুরুজসহ বেশকিছু মাদক সেবনকারী যুবকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে জুলফিকার তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করে এবং তাদের নিয়ে ২০২২ সালে সে ‘ডায়মন্ড’ নামের কিশোর গ্যাং তৈরি করে। সেই থেকে জুলফিকার বাহিনীকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য দিক নির্দেশনা ও অস্ত্র সরবরাহ দিতে শুরু করে। পরে সময়ে সে আরও একটি কিশোর গ্যাং বাহিনী তৈরি করে সেটার নাম দেয় ‘দে ধাক্কা’ কিশোর গ্যাং বাহিনী। বাহিনী দুটিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় সে বিভিন্ন অপকর্ম করতে থাকে।
যেসব এলাকায় সক্রিয় ছিল ‘ডায়মন্ড’ ও ‘দে ধাক্কা’ গ্যাং
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন: মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, নবীনগর হাউজিং, বসিলা হাক্কার পাড় ইত্যাদি এলাকাজুড়ে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া পরিচালনা করতো। তাদের তৎপরতায় কিশোরগ্যাং সদস্যরা এই সব এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে সাধারণ পথচারীদের পথরোধের মাধ্যমে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতো। বিভিন্ন ঠিকাদারের কাজ আটকিয়ে চাঁদা আদায়ের জন্য কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিদেশি পিস্তল দিয়ে ঠিকাদারের কাছে পাঠাতো।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান র্যাব-৩ অধিনায়ক।







