পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে মৌসুমের প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছে।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে তিনটি জাহাজ রওনা দেয়। চলতি মৌসুমে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন রুটে প্রথম এই যাত্রায় অংশ নিচ্ছেন প্রায় ১২শ’ পর্যটক।

জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ট্যুরিস্ট পুলিশের কঠোর তদারকিতে টিকিটের অতিরিক্ত যাত্রী ও প্লাস্টিক পণ্য বহন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সচেতনতার অংশ হিসেবে প্রথম দিন যাত্রীদের এ্যালোমুনিয়ামের পানির বোতল সরবরাহ করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান। সকালেই জেলা প্রশাসকের সাথে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম, কক্সবাজার সদরের ইউএনও নীলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী, ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজারের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদসহ সংশ্লিষ্টরা ঘাটে এসে পর্যটকদের অভিবাদন ও সরকারি নির্দেশনা তদারকি করেন।
ভোর থেকেই এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও কেয়ারি সিন্দাবাদ জাহাজের যাত্রীরা ঘাটে ভিড় জমাতে থাকেন। টিকিট দেখিয়ে জাহাজে উঠার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি যাত্রীর হাতে উপহারস্বরূপ প্রদান করা হয় পরিবেশবান্ধব পানির বোতল।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক অরুপ হোসেন বলেন, প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। ভ্রমণটা খুব রোমাঞ্চকর লাগছে। প্রশাসনের তৎপরতা ভালো লেগেছে, আশা করছি সুন্দর সময় কাটবে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক অনুমতিপ্রাপ্ত জাহাজগুলোতে সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন। আগামী দুই মাস—৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগও থাকবে। যাত্রার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।
‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, মোট ছয়টি জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হলেও যাত্রীর অনুপাতে প্রথম দিনে তিনটি জাহাজ ছেড়ে গেছে। জোয়ার-ভাটা ও নাব্যতা বিবেচনায় প্রতিদিনের যাত্রাসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিকেলে সেন্টমার্টিন থেকে আবার জাহাজগুলো কক্সবাজারে ফিরে আসবে।
বাহাদুর আরও বলেন, আগামী মৌসুমে অন্তত চার মাস রাত্রিযাপনের সুযোগ মিললে জাহাজ মালিকরা ক্ষতি পোষাতে পারবেন। লাভবান হবে পর্যটন খাতও। গত ১ নভেম্বর সেন্টমার্টিনে পর্যটক প্রবেশ উন্মুক্ত হলেও রাত্রিযাপন নিষেধাজ্ঞা থাকায় এতদিন কোনো জাহাজ যাতায়াত করেনি। গতবারের মতো এবারও শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে চারটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে প্রবালদ্বীপে যেতে পারবেন। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৭টায় জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছাড়বে এবং পরদিন দুপুর ৩টায় কক্সবাজারে ফিরবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদিত ওয়েব পোর্টাল থেকে অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি টিকিটে- ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া কোনো টিকিটকে বৈধ ধরা হবে না। জেটিঘাটে টিকিট যাচাইয়ে ট্যুরিজম বোর্ডের ২০ জন ভলান্টিয়ার মাঠে থাকবেন। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের আগমনের খবরে সেন্টমার্টিনে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তবে জেটিঘাটের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, গত একদশক থেকে পর্যটনই আমাদের জীবিকার মূল ভরসা। সংকট থাকলেও আতিথেয়তায় আমরা কোনো ঘাটতি রাখব না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি আলী হায়দার জানান, আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মাঝে জেটিঘাটের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে।
এদিকে সেন্টমার্টিনের নাজুক পরিবেশ ব্যবস্থা রক্ষায় সরকার ঘোষিত ১২ নির্দেশনা এবার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। তার মধ্যে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ বা বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ ও কেয়া ফল সংগ্রহ-বিক্রি, কাছিম, পাখি, রাজকাঁকড়া, প্রবাল, শামুক-ঝিনুকসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় এমন সব কাজ, সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহন, প্লাস্টিকমুক্ত দ্বীপের উদ্যোগ, পলিথিন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিরুৎসাহিত, প্লাস্টিক বোতলের বদলে নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ ও জাহাজে ওঠার সময় পর্যটকদের বিনামূল্যে অ্যালুমিনিয়ামের পানির বোতল দেবে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্লাস্টিক দূষণ কমাতে অ্যালুমিনিয়াম বোতল ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এটা পালন হলে কার্যকর সুফল আসবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খল পর্যটন নিশ্চিত হলে ফের প্রাণ ফিরে পাবে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রশাসন- সব মহলের প্রত্যাশা, পরিবেশ রক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এবার সেন্টমার্টিনে পর্যটন হবে আরও দায়িত্বশীল ও টেকসই।
গত বছর থেকে টেকনাফ রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় কক্সবাজার থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম কিছুটা ক্লান্তিকর হতে পারে বলে মনে করেন অনেক পর্যটক। চট্টগ্রাম থেকে আসা রোকসানা আলী বলেন, আগে টেকনাফ থেকে দ্রুত যাওয়া যেত, এখন রুট লম্বা হওয়ায় জার্নি একটু কষ্টের। তবুও দ্বীপে পৌঁছালে সেই ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক প্রশান্তিই আলাদা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ঘাটে প্রবেশপথে তল্লাশি ও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে নিয়োজিত আছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, পর্যটকরা যেন নির্বিঘ্নে ভ্রমণ উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য সমুদ্রপথে জাহাজে এবং দ্বীপে আমাদের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে। যে কোনো প্রয়োজনে আমরা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার গত অক্টোবরে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ, উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান বা বারবিকিউ পার্টি নয়, কেয়াবনে প্রবেশ ও কেয়াফল সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষেধ, পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইক চলাচল বন্ধ এবং পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
প্রথম দিনের যাত্রা দেখতে ঘাটে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় পর্যটক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত হলেও পুরো নভেম্বর মাস রাত্রিযাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভ্রমণেচ্ছু পর্যটক কম ছিল এবং ওই মাসে কক্সবাজার থেকে কোনো জাহাজই সেন্টমার্টিন যায়নি। ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই তা জেগে উঠেছে নতুন মৌসুমের পর্যটনযাত্রা।









