বাংলাদেশে বন্যায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু এটি একটি রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে এবং অনেকে এই ভয়াবহ বন্যার জন্য দায়ী করছেন ভারতকে। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে দাবি করেছেন বন্যাটি ‘কৃত্রিম’ এবং ভারত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীতে বাঁধ ও ব্যারেজ খোলার ফলে আরো তীব্র হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ভারতপন্থি নীতি বজায় রাখার জন্য সমালোচিত হয়েছেন। এই নিয়ে বাংলাদেশে অনেকেই ক্ষুব্ধ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে জটিলতাও সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক বন্যা দুই দেশের মধ্যে এরই মধ্যে খারাপ সম্পর্ককে আরো তাতিয়ে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকে দাবি করছেন যে, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত গোমতী নদীর ওপর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থিত ডুম্বুর বাঁধ খুলে দিয়ে ভারত বাংলাদেশকে প্লাবিত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবচেয়ে ভাইরাল দাবিগুলোর কয়েকটি খণ্ডন করেছে, ডিডাব্লিউ ফ্যাক্ট চেক।
এক
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ ভারতের তেলেঙ্গানার শ্রীশৈলম বাঁধের একটি ভিডিও দিয়ে দাবি করা হয়েছে এটি ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ। দাবি, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ডুম্বুর বাঁধ থেকে ভারত বাংলাদেশের দিকে পানি ছেড়ে দিচ্ছে। যা ফ্যাক্ট চেকে মিথ্যা হিসেবে ধরা পড়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ব্যবহারকারী একটি বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়ার ভিডিও (এখানে আর্কাইভ করা) পোস্ট করে দাবি করেছেন যে, এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ডুম্বুর বাঁধ। তবে ভিডিওর বাঁধটি আসলে শ্রীশৈলাম মন্দিরের কাছে ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যে অবস্থিত শ্রীশৈলম বাঁধ।
এখানে শ্রীশৈলম বাঁধের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এখানে দেখতে পাবেন ২০২০ সালে গুগল ম্যাপসে যুক্ত করা একটি পুরাতন ভিডিও। সোশ্যাল মিডিয়ার ওই ভিডিও এর সাথে তুলনা করলে বোঝা যায় যে, ২টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ২টি বাঁধ।
আরেকটি সূত্র হচ্ছে আবহাওয়া। ভিডিওতে পরিষ্কার আকাশ এবং ভালো আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। তবে ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে গত সপ্তাহে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছিল এবং বাঁধ খোলার সময় সেই অঞ্চলের আকাশ মেঘলা ছিল।
দুই
ভারত দাবি করেছে যে, ডুম্বুর বাঁধের কোন ফ্লাডগেট খোলা হয়নি। তবে গোমতী জলাধারে ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেট খুলে যায়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করা একটি ভিডিও (এখানে আর্কাইভ করা) এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ভিডিওটি দেখিয়ে দাবি করা হয়েছে, এটি স্বয়ংক্রিয় নয়, বরং ইচ্ছাকৃত ছিল। ভিডিওতে দেখা যায় দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে একটি ক্রেন দিয়ে বাঁধের একটি গেট খোলা হচ্ছে। যা ফ্যাক্ট চেকে মিথ্যা হিসেবে ধরা পড়েছে।

আসল ভিডিওটি (এখানে) ইউটিউবে দুই বছরেরও বেশি আগে পোস্ট করা হয়েছিল। ভিডিওটিতে তিন কোটিরও বেশি ভিউ হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজের একটি গেট পরিবর্তন করার ভিডিও এটি। ফ্যাক্ট চেকে ফারাক্কা ব্যারাজের ভূ-অবস্থান নির্ণয় করে দেখা যায় এই ভিডিওটির সঙ্গে সেখানকার অনেক মিল রয়েছে। ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধের সাথে এর কোন মিল নেই। এই ভিডিওতেও দেখা গেছে পরিষ্কার আকাশ।
তিন
বাংলাদেশে চলমান বন্যার প্রচুর ছবি এবং ভিডিও অনেকেই অনলাইনে শেয়ার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে পুরাতন ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে সেগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বন্যার বলে মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে।
একটি ফেসবুক পোস্টে (এখানে) একজন ব্যবহারকারী দাবি করেছেন যে, নোয়াখালী জেলা প্লাবিত হয়েছে এবং এই দাবির সমর্থনে তিনটি ছবি পোস্ট করেছেন। অবিরাম বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পানির কারণে নোয়াখালী বন্যা কবলিত হয়েছে।
তবে পোস্টে শেয়ার করা সব ছবি সঠিক নয়। প্রথম ছবিটি বাংলাদেশেরই। তবে এটি সিলেটের, নোয়াখালীর নয়। এই ছবি আগস্টের বন্যার নয়, জুনেই এই ছবি গেটি ইমেজেস সংস্থায় প্রকাশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ছবিটি ভারতের আসাম রাজ্যের। সেখানে চলতি বছরের জুন মাসে বন্যা হয়েছিল। ভারতীয় সংবাদপত্র টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় একই ছবি পোস্ট করেছে, যেটি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তোলা।
পর্যাপ্ত ক্লু না পাওয়ায় তৃতীয় ছবিটি সঠিক কিনা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে









