ঈদের ছুটিতে মোটরসাইকেলে করে দুই বন্ধু তোফাজ্জল আর রিয়াদ রাজধানীতে ঘুরবে, সেজন্য তিনদিন হাতে রেখেই বৃহস্পতিবার রাতে চাঁদপুর থেকে রিয়াদ চলে আসে রাজধানীর মানিকদি তোফাজ্জলের বাসায়। ঈদের আগে শুক্রবার রাতে ফাঁকা রাজধানীতে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়েছিলেন তোফাজ্জল। বাইকের চালকের আসনে ছিল তোফাজ্জল আর পেছনে রিয়াদ। কিন্তু দুই বন্ধুর সেই যাত্রা হয় শেষ যাত্রা!
শুক্রবার (২৮ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা মোটরসাইকেলে করে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে কালশি ফ্লাইওভারে উঠেছিল। এ সময় একটি টয়োটা সিএইচ-আর মডেলের প্রাইভেট কারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে মোটরসাইকেলের চালক তোফাজ্জল ফ্লাইওভারের ওপরে এবং পেছনে থাকা আরোহী রিয়াদ ফ্লাইওভার থেকে প্রায় ২৫ ফুট নিচে রাস্তায় ছিটকে পড়ে। পথচারীরা প্রথমে তাদের উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে যায়। পরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১০৯ জন মারা গেছেন। আর পুরো মার্চ মাস জুড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৩৩ জন, যা পুরো মাসের মোট নিহতের ৩৮.৫৭ শতাংশ। সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন ২৪২ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪১.২২ শতাংশ।
গতকাল শনিবার বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এ তথ্য জানিয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) নয়দিনে ১০৯ জনের মৃত্যু, যা নিহতের ৪৭ শতাংশ। মাসের বাকি ২২ দিনে মারা গেছেন ১২৪ জন।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মোটরসাইকেলে মৃত্যু ‘ম্যানমেইড’ মৃত্যু। না জানা অপেশাদার লোকজনের কারণে এই মৃত্যু দেশে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তরুণদের মধ্যে বেপোরয়া বাইক চালানো, ফাঁকা রাস্তায় গতি ঝড় তোলার প্রবণতা রয়েছে। আমাদের বিশৃঙ্খলতা বেশি, আইন না মানার প্রবণতা রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের সমাজ এই মৃত্যুগুলোতে দায়বদ্ধ না। যার ফলে আগামী প্রজন্ম অকালে হারিয়ে যাচ্ছে, পরিবারের স্বপ্ন নষ্ট হচ্ছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, অধিকাংশ যুবকরা ট্রাফিক আইন জানে না, আইন মানে না। তাদের মধ্যে গতির প্রতিযোগিতা এক প্রকারের রোমাঞ্চের সৃষ্টি করে। এছাড়া মোটরসাইকেল বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ‘গতির ঝড় তোলা’ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যুবকদের উৎসাহিত করে।
বিআরটিএ’র সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে বিআরটিএ’র সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্বল্প দূরত্বে গমনের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহারের উদ্দেশ্য থাকলেও বর্তমানে এসব যান মহাসড়ক ও দূরপাল্লায় চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মোটরসাইকেল চালনাকালে অনেক ক্ষেত্রে হেলমেটসহ নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হচ্ছে না, ফলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, নিয়ন না জানা বা না মানা ইত্যাদিও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে বিআরটিএ’র আহ্বান জানিয়ে বলছে, অভিভাবকগণ সন্তানদেরকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করুন। শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনে স্বল্প দূরত্বে মোটরসাইকেল ব্যবহার করুন। দূরপাল্লা বা মহাসড়কে মোটরসাইকেল ব্যবহার করবেন না। মোটরসাইকেল চালনাকালে একজনের বেশি আরোহী বহন ও ওভারটেকিং করবেন না। মোটরসাইকেলে সবসময় স্বল্প গতি বজায় রাখুন অর্থাৎ দ্রুত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালাবেন না।
করণীয় কী?
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মোটর সাইকেল চালকের অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। মান সম্মত হেলমেট ও সুরক্ষা জন্য সব রকমের কিটস ব্যবহার করতে হবে।

নিদিষ্ট গতিতে গাড়ি চালাতে হবে। দূর পাল্লার গণপরিবহণের বিকল্প কখনো মোটরসাইকেল হতে পারে না। পাশাপাশি আমাদের গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে। তারা অবশ্যই মোটরসাইকেলের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপণ দেশের তরুণদের জন্য সেন্সর করে প্রচার করবে। ঈদ যাত্রার সময় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করবে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু রোধ করতে হলে আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মোটরসাইকেলের বিচরণ ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, হাইওয়েতে মোটরসাইকেল বেমানান। আমাদের মোটরসাইকেলের সহজলভ্যতা কমাতে হবে। রেজিস্ট্রেশন ফ্রি বাড়ানোর পরিবর্তে কমিয়ে রাখা হয়েছে।
মোটরসাইকেল বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য
রাজধানীর তেঁজগাওয়ে দুটি মোটরসাইকেল প্রতিষ্ঠানের কর্মরত বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, মোটরসাইকেল রাইডারদের জন্য সেফটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেফটির জন্য রাইডারের সেফটি গিয়ার ও এপারেলস ভাইটাল ইস্যু। আমরা গ্রাহকদের মোটরসাইকেলের বাজেটের পাশাপাশি সেফটি গিয়ারের বাজেটের বিষয়েও তাদের অবগত করে থাকি।
তাদের শোরুমগুলোতে মোটরসাইকেল বিক্রয়ের পাশাপাশি ফুলফেইজ হেলমেট, বডি সেফটি গার্ড, রংবিহীন ও ন্যাচেরাল ট্রান্সপারেন্ট ভাইসর ফুল সাইজ গ্লাভস,নি ও এলবো গার্ড এবং অল ওয়েদার উইন্ড ব্রেকার বিক্রি করে থাকেন।
যা বলছেন সচেতন চালকেরা
মোটরসাইকেলে প্রতিদিন টঙ্গী থেকে ঢাকায় অফিস করা গণমাধ্যমকর্মী শেখ জাহাঙ্গীর আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমার বাড়ি ফিরতে বেশিরভাগ সময়ই রাত হয়। যেহেতু আমি মোটরসাইকেল চালাই তাই আমি অন্ধকারে স্পষ্ট চোখে পড়ে এমন বর্ণের পোশাক পড়ি।

পাশাপাশি মোড় ঘোরার সময় খেয়াল রাখি, আমি যাতে ব্লাইন্ড স্পটে পড়ে না যাই। এছাড়াও আরও কিছু বিষয়ে সতর্ক হলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। সেগুলো হলো মোটরসাইকেল চালানোর সময় ফোনে কথা না বলা, খারাপ আবহাওয়ায় এড়িয়ে চলা, ঘন ঘন ওভারটেকিং না করা, মোটরসাইকেলের রুটিন চেকআপ করা।
চ্যানেল আইয়ের বিপণন বিভাগে কর্মরত নারী মোটরসাইকেল চালক লিমা শিমু জানান, আমরা মোটরসাইকেল কেনার সময় যতোটা ব্র্যান্ডের চিন্তা করি, কিন্তু হেলমেট বা অন্যান্য সেফটি গিয়ারের কেনার ব্যাপারে উদাসীনতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। আমরা চালকেরাই নিজেদের নিরাপত্তার বিষয় নিজেরাই ভুলে যাই। আমি সবসময় সার্টিফাইড হেলমেট ব্যবহার করি। নির্দিষ্ট গতিতে বাইক পরিচালনার পাশাপাশি সব সময় ট্রাফিক আইন মেনে চলি।
‘এছাড়াও মোড়ে সতর্ক থাকা, গতি কমানোর সময় পেছনে দেখা, জ্যাম ও পার্ক করা গাড়ির কাছাকাছি গেলে সতর্ক থাকা, ইউটার্ন নেয়ার সময় সতর্ক থাকা প্রত্যেক চালকের উচিত।’









