এই গ্রামে সন্ধ্যার পরপরই গভীর অন্ধকার ভর করে, আমার এক ফেলো ফিল্মমেকার সেদিনের সেই অন্ধকারেই বেলা তারকে নিয়ে আলাপ শুরু করেছিল। বেলা তারের প্রতি আমার অগাধ মুগ্ধতার কথা সে জানে। আমি তাকে কথার মাঝখানে থামাই, অহেতুক প্রশংসা কিংবা নিন্দার টানাপোড়েন নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নাই। তাকে আমি ছোট্ট করে বলি- আব্বাস কিয়ারোস্তামিকেও আমার ভালো লাগে তবে তার সিনেমা দেখতে বসে আমার তারকোভস্কির কথা মনে পড়ে কিন্তু বেলা তারের সিনেমা দেখতে বসে আমি শুধু বেলা তারেই বুঁদ হয়ে থাকি।
‘অতল’ আদৌ সিনেমা হয়ে উঠছিল কিনা এই দ্বিধা কাটাতে, একটা রাফকাট তৈরি করে জামান ভাইয়ের (চলচ্চিত্রকার মোহাম্মদ নূরুজ্জামান) নারায়ণগঞ্জের অফিসে যাই। দুজনে বসে ‘অতল’ দেখতে শুরু করি। “বেলা তার দেখে তোমাদের সাহস বেড়ে গেছে, লম্বা লম্বা টেক নাও!” জামান ভাইয়ের কথায় আমি চমকে যাই। “ভাই আমি বেলা তার দেখি নাই।” জামান ভাই বললেন “কী বলো! বেলা তার দেখো।” গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে তখন দুই হাজার একুশের শেষ দিক হবে, অনেক পরেই বেলা তারের সঙ্গে ‘দ্য তুরিন হর্স’ মারফত আমার পরচিয়।

দুনিয়ার শেষ চলচ্চিত্রটি কেমন হবে ভাবতে গেলে আমার ‘তুরিন হর্স’-এর কথা মনে পড়ে, মনে হয় ভয়াবহ যুদ্ধশেষে বিষন্ন পৃথিবীতে আমরা আছি, যেখানে অভিশাপ নেমে এসেছে, তুমুল হাহাকার তোলা বাতাসের মধ্য দিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি কুয়ার শেষ পানিটুকু তুলতে। বার্গম্যানের ছবিতেও দুনিয়ার শেষ চলচ্চিত্রটির ইশারা আমি পাই, যেখানে চরিত্রগুলো বিদায়ের আগে খোদার সঙ্গে অনবরত কমিউনিকেট করার চেষ্টা করছেন। তবে আমার কাছে বেলা তারের ছবি এই ইশারার পূর্ণতা দেয়। অবশ্য বেলা তার- গোদার কিংবা বার্গম্যান কিংবা তারকোভস্কিরই পরম্পরা! তাদের মতই সে ভীষণ দানবীয়, যে প্রচলিত গল্প বলার খপ্পরে না আটকে নিজেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন, বোধিপ্রাপ্ত হয়েছেন। আবার অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের এই অঞ্চলের বুদ্ধদেব দাশগুপ্তসহ অনেকের ছবিতেই তারকোভস্কির ছাপ টের পাওয়া যায়। অনেকেই আবার বার্গম্যান, এমনকি গোদারকেও ট্রিবিউট করেছেন তাদের চলচ্চিত্রে। কিন্তু বেলা তারকে অনুকরণ করা কঠিন, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব।
ভিজ্যুয়ালে বেলা তার অন্য উচ্চতায় বিরাজমান। এই মানুষটা সদ্য শরীর ত্যাগ করেছেন। আর শরীর ত্যাগ করার বড় কারিশমা হলো তিনি প্রচলিত ঈশ্বরের মত বায়বীয় হয়ে ওঠেন, যে কেউ তাকে স্মরণ করলে তিনি সামনে হাজির হন, প্রয়াত প্রিয় মানুষের সঙ্গে তখন কথপোকথনও সহজ হয়ে যায়। তবে বেলা তারের প্রসঙ্গ আসলে এমনটা খাটে না, তিনি বরং জীবদ্দশাতেই বায়বীয় হয়ে ওঠেছিলেন। দুনিয়াতে তার এক্সিজটেন্স থাকা সত্ত্বেও তাকে মনে হতো স্বর্গীয় কোন চরিত্র, হঠাৎ হঠাৎ দুনিয়াতে এসে হাজির হন, কমিউনিকেট করেন আমাদের সঙ্গে। সিনেমার বাইরে একদিন আমার সঙ্গেও তার কমিউনিকেট হয়েছিল, তাকে আমি স্বপ্ন দেখি, আমিসহ আরো কয়েকজন বেলা তারের ক্লাস করছি, বাকিদের মুখগুলো আমার স্মরণে নাই, বেলা তার ক্লাসে কী কী যেন বললেন, ক্লাস শেষে আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই, তিনি স্বভাবসুলভ তাচ্ছিল্যের কণ্ঠে বললেন- যেভাবে সিনেমা বানাচ্ছো বানাতে থাকো।

এতটুকু লেখার পর আমি আটকে যাই কিংবা লেখাটা শেষ করতে হবে এই ভাবনায় আমি শুরু থেকেই আটকে ছিলাম। অথচ বেলা তারের কোন তাড়াহুড়া ছিল না। জীবনের যে দীর্ঘ সূত্রিতা, অপেক্ষার যে শেষ না হওয়ার পালা, তিনি তার সিনেমায় তা অস্বীকার করেননি বরং সময়ই তার চলচ্চিত্রের স্ট্রাকচার হয়ে ধরা দিয়েছে, যেখানে আলাদা করে গল্পের প্রয়োজন হয় না।









