‘অমর্ত্য’ নামটি রেখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পারিবারিকভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমর্ত্য সেনের নানির বাড়ির পরিবারের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অমর্ত্য সেনের নানা ক্ষিতিমোহনকে রবীন্দ্রনাথ খুবই আন্তরিকতার সাথে শান্তিনিকেতনে কাজ করতে অনুরোধ করেন। শান্তিনিকেতনে শিক্ষার ব্যাপার ছাড়াও গ্রামীণ পুনর্গঠন ও সংস্কারের জন্য তাকেই যথোপযুক্ত মনে হয়েছিল কবিগুরুর।
শান্তিনিকেতনের সাথে ৫০ বছরেরও বেশি সময়ে যুক্ত ছিলেন ক্ষিতিমোহন। আর সেখানেই নানীর বাড়িতে বেড়ে ওঠা অমর্ত্য সেনের। যদিও বাবা আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমেস্ট্রি বিভাগে পড়াতেন (১৯২০ এর দশকে লন্ডনে পিএইচডি করা)। পুরান ঢাকার ওয়ারী অঞ্চলে ঠাকুরদার তৈরি বাড়িতে ছিল তাদের বসবাস। বাড়িটির নাম ছিল ‘জগৎ কুটির’। বইটির নামকরণের সাথে বাড়ির নামের মিল। যেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তার ছোটবেলা থেকে জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত যেসব জায়গায় বেড়ে উঠেছেন কিংবা চলেছেন প্রতিটি জায়গাই তাকে আলাদাভাবে টেনেছে। এখানে বাড়ি বলতে তিনি আসলে নির্দিষ্ট কোন স্থানকে কে বুঝাতে চাননি, বিশ্বময় তার বিচরণকেই অনুভব করেছেন।
অমর্ত্য সেনের ঠাকুরদা সারদা প্রসাদ সেন ছিলেন ঢাকা আদালতের একজন বিচারক। পরবর্তীতে অমর্ত্য সেন শান্তিনিকেতনে নানা নানীর পরিবারের সাথে বেড়ে ওঠেন। অমর্ত্য সেন বারবারই বলেছেন, মূলত শান্তিনিকেতনে এসেই নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন তিনি। ঢাকা থেকে শান্তিনিকেতন ফেরত আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমি খুব দ্রুত আবিষ্কার করলাম, নতুন এক জীবনের আনন্দ পেতে হলে তার মধ্য থেকে পুরনো কোন কিছু হারিয়ে ফেলার খাঁ খাঁ ভাবটাকে বিসর্জন দিতে হয় না। সেটাও এরই অংশ। অমর্ত্য সেন যখন বাংলাদেশে আসেন নোবেল বিজয়ের পর, সেই সময় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিস স্কুল কর্তৃপক্ষ তার খাতা খুঁজে দেখেন ফলাফল খুবই খারাপ ছিল (যা তিনি মজার গল্পের ছলে বলেছেন)। মূলত শান্তিনিকেতনের স্বাধীন জীবনই তাকে আরও সমৃদ্ধ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে।
শুরুতেই বলছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন একজন প্রথিতযশা নৃত্যশিল্পী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কয়েকটি নৃত্যনাট্যে তিনি প্রধান নারী চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। যদিও তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের জন্য তা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। অমর্ত্য সেনের উদার মানসিকতার বাবা তা দেখেই অমিতাকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে বাবার চাকরি সূত্রে বার্মা তথা মিয়ানমারে কয়েক বছর বেড়ে ওঠেন অমর্ত্য সেন। সেখানকার স্মৃতিচারণ করেছেন পাশাপাশি অং সাং সুচি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিস্তারিত লেখা আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন মারা যান তখন অমর্ত্য সেনদের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। ছোট বয়সে তিনি এই শোকের অর্থ বুঝতে পারেননি, শুধু বুঝেছিলেন কেউ একজন মারা গেছেন যিনি তাদের পরিবারের খুব কাছের মানুষ। পরবর্তীতে এই রবীন্দ্রনাথই তার জীবনের বড় অংশ জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে তুলে ধরেছেন বারবার।
রবীন্দ্রনাথের সাথে অমর্ত্য সেনের একটা মজার স্মৃতি। প্রতি বুধবার সকালে সাপ্তাহিক সভা হতো শান্তিনিকেতনে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা বিষয়ক ভাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। সবাই চুপ করে শুনবে এমনটি ছিল রীতি। পাঁচ বছর বয়সী অমর্ত্য সেন একদিন দাদু দিদিমার সাথে সেই সভায় গিয়েছিলেন। যেখানে দিদিমা বলেছিলেন ওখানে কোন কথা বলা যাবে না, চুপ করে থাকবে। শিশুটিও বলেছিল কোন কথা বলবে না। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বক্তৃতা শুরু করলেন, তখন ছোট্ট অমর্ত্য সেন চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন- দিদিমা, তুমি তো বলেছিলে এখানে কোন কথা বলা যাবে না তাহলে ওই লোকটা এত জোরে জোরে কথা বলছে কেন!! কথাটি শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুচকি হেসেছিলেন।
অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল জয়ী বাঙালি অমর্ত্য সেনের জগৎ কুটির বইটি পড়া শেষ করতেই প্রথম যে লাইনটি মনে আসে তা হলো বন্ধুত্বের বিকাশ সাধারণত শ্রেণীর গণ্ডির মধ্যেই হয়। এই লাইনটি আমার বেশ মনে ধরেছে এবং জীবনের এই অল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় এটিকে আমার জন্য বেশ সময়োপযোগী ও শিক্ষণীয় মনে হয়েছে। পরে বইটি যখন আরও গভীরে পড়তে শুরু করি দেখলাম কীভাবে জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার হয়ে উঠেছেন অমর্ত্য সেন। সেই সাথে তার বন্ধুত্বের গণ্ডি। প্রথমে বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের দিয়েই শুরু করি। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এবং তার স্ত্রী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সালমা ইক্রামুল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আইন ও শালিস কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ক্যামব্রিজ মজলিশে তাদের পরিচয়। অমর্ত্য সেনসহ এই তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। অমর্ত্য সেনের অন্যান্য বন্ধুরাও গ্রিস ও তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী, আবার অনেকেই হয়েছেন কূটনীতিক।
অ্যান্টোনিও গ্রামশি, পিয়ারে স্রাফা, মরিস ডব সবার সাথেই ঘনিষ্ঠতার গল্প বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় আছে। ট্রিনিটি কলেজে অমর্ত্য সেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন অর্থনীতিবিদ (জামাইকান) ডোনাল্ড হ্যারিস এবং ক্যান্সার গবেষক শ্যামলা গোপালন (ভারত)। যারা ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কমলা হ্যারিসের বাবা মা। কমলা হ্যারিসের জন্ম ও ছোটবেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন অমর্ত্য সেন। বাংলাদেশের সংবিধানের রূপকার ড. কামাল হোসেন অক্সফোর্ডে পড়লেও ছাত্র জীবনে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা ছিল তার সাথেও। অমর্ত্য সেনের ক্যামব্রিজে পড়তে যাওয়া ও সেখানকার স্মৃতিচারণ, কর্মজীবনের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতায় ভরপুর বইটি।
বাংলার নদী, মাঠ ঘাট, পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠার স্মৃতিকথার পাশাপাশি ৫শ’ পৃষ্ঠার পুরো বইটি জুড়ে আছে ব্রিটিশ শাসন, বাংলার দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশ আমলের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্রে তার উপস্থাপনা, বুদ্ধের বাণী, বাই সাইকেলে করে শান্তিনিকেতনের আশেপাশে গ্রামে ঘুরে দুর্ভিক্ষের চিত্র অনুধাবন, বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আচার্য হওয়ার অভিজ্ঞতাসহ আরও অনেক কিছু। সিল্ক রুটের কথা বলা হয়েছে- যেখানে শুধু বাণিজ্য নয় শিক্ষা মানুষকে এক করে।
বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে সুন্দর সুন্দর কিছু লাইন উঠে এসেছে। যেমন :
* শুধু শক্তি-ই নয়, দুর্বলতাও মানুষকে একে অপরের কাছে এনে দিতে পারে। জীবনে এই কারণেই সুন্দর।
* হাজার প্রতিকূলতা থাকলেও নিজের যা করণীয় তা যে করতেই হবে, নিজের লক্ষ্যে স্থির অচঞ্চল থাকতে হবে ( কঠিন রোগ থেকে মুক্তির পর)।
* শিক্ষা নানা রূপে আসে।
* যে বিদ্বেষের ঘটনাই শুনবে, জানবে যে তার চেয়েও ঘৃণ্য কোনও ঘটনা হয়তো পৃথিবীতে আছে।
বইটিতে আরও আছে- দারিদ্রতা ও জীবনের স্বাধীনতা নিয়ে বাস্তব গল্পের উপস্থাপনা।









