পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি বলেছেন, গত কয়েকদিনের স্থবিরতায় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সরাসরি রপ্তানীতে ক্ষতি হয়েছে ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি জানিয়েছেন, এক দিন কারখানা বন্ধ থাকলে ১৬ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয় যা দেশি মুদ্রায় ১ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।
পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বলেছেন, গত ১ সপ্তাহে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলমান স্থবিরতায় দিনে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। নাশকতায় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব বুঝবার জন্য উল্লিখিত পরিসংখ্যান যথেষ্ট। দেশের প্রত্যেকটি খাত ও উৎপাদনশীল কর্মকান্ডে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সহিংসতার কারণে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ১ দিনে ফ্রিল্যান্স খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮০ কোটি টাকা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত সম্পন্ন ব্যক্তিরা বলছেন, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। বৈদেশিক লেনদেন, ই-কমার্স, অনলাইন আর্থিক সেবা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি সেবা, মোবাইল রিচার্জসহ নানা ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে। দুষ্কৃতিকারীদের আক্রমণে মহাখালীর ডাটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে নিয়মিত মিটিং করতে ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্টরা। এতে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয় বাংলাদেশে। ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট মাধ্যম ছাড়া যোগাযোগ টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য এবং ইন্টারনেট কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে, কোন কিছু ঘটলেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়। স্বাভাবিক এ ঘটনা থেকে সহজে প্রতীয়মান হয়, হামলাকারীদের নেপথ্য কারা জড়িত? এ ব্যাপারগুলো নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অবগত থাকার প্রয়োজন রয়েছে। চলমান নাশকতায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ক্ষতির পরিমাণ ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সহিংসতায় সারাদেশে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের ৩১৩টি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। সংঘাত-সংঘর্ষ চলাকালে সারাদেশে পুলিশের ২৩৫ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে সহিংসতায় ৬৯টি পুলিশ বক্সসহ ৮০টি স্থাপনা ও কার্যালয় ভাংচুর করে আগুন দেওয়া হয়েছে। ডিএমপিতে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ৬১ কোটি টাকা। গাজীপুরের টঙ্গীতে হামলা, ভাংচুর ও আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৮ কোটি টাকা। টঙ্গী চেরাগআলী বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ও ডেসকো অফিসে হামলা ভাংচুর ও আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। টঙ্গী পৌরসভা অফিসে হামলা, ভাংচুর ও বর্জ্য অপসারণের গাড়িসহ ২০টি গাড়ি ভাংচুরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকা। বেক্সিমকো অফিসে হামলা ও গাড়িতে আগুনের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ তিন কোটি টাকার উপরে এবং বিদ্যুৎ অফিসের দুটি সাবস্টেশন অটোমেশিন ভাংচুরে ক্ষতির পরিমাণ দুই কোটি টাকা। এছাড়া দেশের অন্যান্য জেলা উপজেলাতে নাশকতাকারীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। হামলাকারীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি মেডিকেল সার্ভিসের পরিবহন। কাজেই দৃষ্কৃতিকারীদের টার্গেট ছিল কার্যত দেশকে অচল করে দেওয়া এবং সে কারণেই তারা দেখে দেখে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে দিতে সোচ্চার ছিল।
জানা যায়, চট্টগ্রাম কাষ্টমসে প্রতিদিন সরকারের আয় হয় ২০০ কোটি টাকা। চলমান নাশকতায় বন্দরে পণ্য উঠানামা বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্র। এদিকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দৈনিক পদ্মা সেতুতে রাজস্ব কমেছে দুই কোটি টাকা। জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১৯ হাজার ১৬৮ যান পারাপারে গড়ে টোল আদায় হতো ২ কোটি ৩২ লাখ ১৪ হাজার ২২ টাকা। বর্তমান সময়ে প্রায় ৩ হাজার যান পারাপার হচ্ছে এবং টোল আদায় হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখের মতো। এ ধরনের পরিসংখ্যানগত চিত্রই বলে দেয়, রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দেশের সকল সেক্টরে সাম্প্রতিক সংঘাত ও সহিংতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
মেট্রোরেলের ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা গা শিউরে উঠার মতো। ঢাকার মানুষের কাছে সময় বাঁচানোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল পরিবহনটি। কিন্তু দৃষ্কৃতিকারীরা মেট্রোরেলের দুটি স্টেশনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানায়, মেট্রোরেল ঠিক করতে এক বছর সময় লাগবে এবং ক্ষতি মেরামত করতে কত টাকা লাগতে পারে সেটি এখনও বলা যাচ্ছে না। কারণ মেট্রোরেলের যন্ত্রাদি ইউরোপ ও জাপান থেকে আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে, বিআরটিএ ও সেতু ভবনের প্রথম পাঁচ তলা একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দুষ্কৃতিকারীরা প্রথমে সেখান থেকে লুট করেছে, পরে আগুন দিয়ে ভবন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে তবে স্বাভাবিকভাবে ধারণা করা যায়, কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বিআরটিএ ভবনে। দু দফা হামলায় সেতু ভবনের ৫৫টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জানা যায়, বিআরটিএ ভবনে রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বুথসহ অন্যান্য সকল সেবা খাতে মারত্মক আঘাত হেনেছে দুষ্কৃতিকারীরা।
দুর্যোগ ভবন, খাজা টাওয়ারের ডাটা সেন্টার, বিটিভি ভবন, পুলিশ ফাঁড়ি, পুলিশ স্টেশন, ডাকঘর, হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা, গাজীপুরের বিআরটিএ প্রকল্পের ১৬ এক্সকেভেটর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এসব সম্পত্তি ও স্থাপনার হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার যে সকল স্থাপনা ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো খুব দ্রুত মেরামত করে কাজের উপযোগী করাও দুঃসাধ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় স্থাপনার বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের নজির তেমন নেই বর্তমান নাশকতায় যেটি পরিলক্ষিত হয়েছে। এখন নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। আবার নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। দেখা গেছে নাশকতাকারীরা হামলার সময় সংশ্লিষ্ট ভবনের সিসি ক্যামেরা ধ্বংস করে দিয়েছে। কাজেই ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও এলাকার আশেপাশে বাসা বাড়ি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজে হামলার চিত্র উঠে থাকলে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে অবহিত করা প্রয়োজন। হামলাকারীরা আমাদের আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনভাবে তাদেরকে শনাক্ত করা সম্ভব হলে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।নাগরিক হিসেবে এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
দেশজ উৎপাদনের ব্যবহার ও রপ্তানিতে মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। নাশকতার কারণে পরিবহন সেবা বন্ধ থাকায় বিশেষ করে রাজশাহীরা আম ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সন্মুখীন হতে চলেছেন। অনলাইনে বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে, পরিবহন সংকটের কারণে দেশের অন্যান্য জেলায় আম পাঠাতে না পারায় গাছে আমের পচন ধরেছে। আমের উৎপাদন এখন প্রায় শেষের দিকে, এ সময়ে সর্বসাকুল্যে গাছের আম বিক্রি করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বাইরে রপ্তানী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আম চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ধরনের দেশীয় পণ্য বিদেশে রপ্তানী বন্ধ থাকায় দেশীয় অনেক উদ্যোক্তা চরম ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেস। অর্থাৎ দেশীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। বলা যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তরা নাশকতা ঘটিয়েছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলেন, অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা জরুরি। নাশকতাকারীরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যেভাবে উত্তপ্ত করে তুলেছে তা থেকে উত্তরণে সরকারের পাশাপাশি দেশের জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। যে সম্পদের বিনাশ হয়েছে সেসব জনগণের সম্পদ, রাষ্ট্রের সম্পদ। যারা জনগণের সম্পদ বিনষ্ট করেছে, রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি করেছে তারা দেশ ও রাষ্ট্রের শত্রু তথা প্রতিপক্ষ। তাদেরকে অতীব সত্ত্বর চিহ্নিত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে, বিচার করতে হবে। সকলকে জানিয়ে দিতে হবে রাষ্ট্রের সম্পদ বিনষ্টকারীদের ব্যাপারে রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









