নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না শহীদুল্লাহর নাম এবং নাম জানলেও জানে না কী তার অবদান। তাদের জন্যই বলছি, বাংলা ভাষার গবেষক হিসেবে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রধান অবদান হলো, চর্যাপদের বিষয়বস্তু এবং তার কবিদের পরিচয় তুলে ধরা, বাংলাভাষার উৎপত্তিকাল নির্ধারণ করা (শহীদুল্লাহর মতে এটি ৬০০ থেকে ৭০০ অব্দের মধ্যে), বাংলা ভাষার উৎপত্তি যে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে সেটি বলা, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন করা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রণয়ন।
তবে আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে তার প্রধান অবদান ভাষা আন্দোলনে দার্শনিকের ভূমিকা পালন করা। শহীদুল্লাহ বাঙালি মুসলমানকে শিখিয়েছিলেন মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ। তিনি ইসলাম ধর্মের অনুশাসনগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলতেন। অথচ তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী।
তিনি তার জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে জাতিকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নিজের ধর্মে নিষ্ঠাবান হয়েও অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করা যায়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ স্থাপন করা যায়। স্মরণ করিয়ে দেই তার অমর উক্তি ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয় এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা তিলক টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো-টি নেই।
এই কথা শহীদুল্লাহ বলছেন ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে। তখন চারিদিকে যখন পাকিস্তানি হওয়ার জিগির তখন শহীদুল্লাহ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে আমাদের ধর্ম যাই হোক আমরা একই ভূখণ্ডের মানুষ।
ধর্মকেও তিনি যতটা বুঝতেন ততোটা অন্য অনেক ধর্ম বিষয়ক পণ্ডিতও বুঝতেন কিনা সন্দেহ। কারণ একাধারে কোরআন হাদিস ও গীতা, বেদ, বাইবেল পড়া মানুষ, আরবি, ফার্সি, হিব্রু এবং সংস্কৃত, পালি, প্রাচীন পাহলবি এবং ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান জানা মানুষ সারা বিশ্বেই বিরল।
তিনি সনাতন বৈদিক শাস্ত্র ও আর্যভাষা ও সাহিত্য যেমন জানতেন তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি, ভাষা, আব্রাহামীয় ধর্মসমূহকেও জানতেন।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এ কারণেই শহীদুল্লাহকে নিয়ে রক্ষণশীল এবং প্রগতিশীল দুই দলের মধ্যেই কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। প্রগতিশীলরা শহীদুল্লাহর লম্বা দাড়ি, টুপি এবং ধর্ম নিষ্ঠার বিষয়টিকে অস্বস্তির সঙ্গে দেখে। তাকে ‘যথেষ্ট প্রগতিশীল’ মনে করে না।
অন্যদিকে মুসলিম রক্ষণশীলরা তাকে ইসলামী জ্ঞানে সুপণ্ডিত হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হলেও তার বাংলা ভাষাপ্রীতি, তার সংস্কৃত ভাষার জ্ঞান, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম নিরপেক্ষ মনোভাবে বিরক্তি বোধ করে।
হয়তো এসব কারণেই বাংলা মায়ের এ কৃতী সন্তান উপেক্ষিত এবং বিস্মৃতপ্রায়।
লেখক: শান্তা মারিয়া
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








