সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার ছয়দিন আগেই জেনে যান ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। কিন্তু বিষয়টি তিনি চেপে যান। গোয়েন্দারা খুঁজতে থাকেন কেন, কীভাবে, কী কারণে এ হত্যাকাণ্ডে মিন্টুর নাম সামনে আসছে।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার মিন্টু বর্তমানে আট দিনের রিমান্ডে আছেন। এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে মিন্টুর যোগাযোগ, কিলার আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তার নাম আসা, তার আগে থেকে আনারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয় সামনে এনে ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এমপি আনোয়ারুল হত্যায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর জড়িত থাকার বিষয়টি প্রথমে সামনে আসে কিলার আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে। শিমুল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিতে তার নাম বলেন। এছাড়া ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর নামও ফাঁস করেন শিমুল। এরপর এর উত্তর মেলাতে গিয়ে গোয়েন্দাদের তদন্তে সন্দেহভাজন কিছু বিষয় ঘুরপাক খায়।
আনোয়ারুল হত্যার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগে কেন গ্যাস বাবুর মোবাইল থেকে ছবি দেখে তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন মিন্টু? নিজ জেলার একজন সংসদ সদস্যকে ভিন দেশে হত্যা করার মতো লোমহর্ষক ঘটনার ক্লু পেয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাননি তিনি। ওই সময় আনারের পরিবারের সদস্যরা নানা জায়গায় আনারকে খোঁজাখুঁজি করেছিলেন। যখন অনেকেই জানতেন আনার হয়তো নিখোঁজ, তখন মিন্টু নিশ্চিত হয়ে যান আনারকে হত্যা করা হয়েছে। কলকাতা থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগেই কেন হঠাৎ বাবুর তিনটি মোবাইল গায়েব? এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বাবু। পরে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বাবু দাবি করেন, তার ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নিয়ে গেছেন মিন্টু। এসব নষ্ট করে ফেলা হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই মোবাইলে খুনের অনেক আলামত ছিল। সবকিছু সামনে আসার শঙ্কায় তিনটি মোবাইল সরিয়ে ফেলা হয়। এ ব্যাপারে মিন্টুকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া কেন খুনের এক সপ্তাহ আগে ৬ মে সঞ্জীবা গার্ডেনস থেকে মিন্টুকে ফোন করেন শাহীন ও শিমুল- এ বিষয়েও জানতে চাওয়া হচ্ছে মিন্টুর কাছে।
গোয়েন্দাদের ভাষ্য, অগ্রিম ২০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আর হত্যা মিশন সফল করতে টাকার অঙ্ক ছিল ২ কোটির বেশি। এমনকি হত্যা মিশন সফল করে ১৫ মে ঢাকায় আসেন শিমুল ভূঁইয়া। এরপর টাকা পরিশোধের জন্য গ্যাস বাবুকে ফোন করেন। দিন-তারিখ ঠিক হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করেননি বাবু।
৬ দিন আগে হত্যার ছবি পান মিন্টু
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় ২২ মে। তবে এমপি আনার হত্যার ছবি মিন্টু ১৬ মে দেখেছেন। তাহলে মিন্টু এত আগে জেনেও কেন গোপন করলেন। সাইদুল করিম মিন্টু কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন কালীগঞ্জ থেকে এমপি হওয়ার, নমিনেশন পেপারও তিনি কিনেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় টাকা-পয়সার ইস্যুও আসামিদের জবনাবন্দিতে এসেছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এর আগে গত ১১ জুন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধানমন্ডি থেকে সাইদুল করিম মিন্টুকে আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। গত ২২ মে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় খুন করার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
মামলার অভিযোগে মুনতারিন ফেরদৌস ডরিন উল্লেখ করেছেন, মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বাসায় আমরা সপরিবারে বসবাস করি। ৯ মে রাত ৮টার দিকে আমার বাবা আনোয়ারুল আজিম আনার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১১ মে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বললে বাবার কথাবার্তায় কিছুটা অসংলগ্ন মনে হয়। এরপর বাবার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও বন্ধ পাই।
গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে নিখোঁজ হন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম। ২২ মে কলকাতা পুলিশ জানায়, আনোয়ারুল খুন হয়েছেন। একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও জানান, আনোয়ারুল আজিমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একই দিন আনোয়ারুলের খোঁজ চেয়ে রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানায় মামলা করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরুর পর আসতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল থেকে কয়েকজনকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে শিমুল ভুইঁয়া ওরফে শিহাব ওরফে ফজল মোহাম্মদ ভুইঁয়া ওরফে আমানুল্যাহ সাঈদ, তানভীর ভুইঁয়া ও শিলাস্তি রহমান রিমান্ড শেষে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় সর্বশেষ যোগ হলেন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু।









