জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাবার পানির সংকট কক্সবাজার জেলায় দিন দিন বেড়েই চলছে। বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, লবণাক্ত পানির প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে এ সংকট তৈরি হচ্ছে।
সংকটময় এই সময়ে মানুষকে নিরাপদে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে হাইসাওয়া নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। পরিবেশবিদদের মতে, বৃষ্টির পানির সংরক্ষণসহ এখনই জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জানা যায়, কক্সবাজারের ৮টি উপজেলাতে নিরাপদ খাবার পানির সংকট রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেটি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় টিউবওয়েল থাকলেও পানি উঠে না। আবার অনেক এলাকায় ময়লাযুক্ত পানির কারণে সেটি খাওয়া যায় না। ফলে কক্সবাজার জেলায় সুপেয় পানির সংকট লেগে আছে।
কক্সবাজারের রামুর চাকমারকুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আহমেদ পাড়ার গৃহিনী ইয়াছমিন আক্তারের খাবার পানি সংগ্রহ করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এ নারীকে বেশির ভাগ সময় স্বামী মো. মোজাম্মেল এক-দেড় কিলোমিটার দূর থেকে পানি এনে দিতেন। তবে স্বামী জীবিকার খোঁজে বের হলে বাড়তো ইয়াছমিনের অসহায়ত্ব। বাধ্য হয়ে খাওয়াসহ দৈনন্দিন কাজ সারতেন পাশের বাড়ির নলকূপের ময়লা পানি দিয়ে।
ইয়াছমিনের বহুদিনের ইচ্ছে ছিল একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করবেন। কিন্তু দিনমজুর স্বামীর সেই সামথ্য হয়ে উঠেনি। অবশেষে ইয়াছমিনের কষ্ট দূর করেছে বেসরকারি অলাভজনক সংস্থা-হাইসাওয়া।
ইয়াছমিন আক্তার ছাড়াও পাশ্ববতী রহিমা খাতুন, ফুলমতি বেগমসহ আরো ৫৫ পরিবারের পানির কষ্ট দূর হয়েছে। পরিবারগুলোকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়ির উঠোনে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে হাইসাওয়া। এ নিয়ে উপকারভোগীদের আনন্দের শেষ নেই। পানি ছাড়াও দরিদ্র পরিবারগুলোকে ‘পরিবারভিত্তিক উন্নত ল্যাট্রিন’ সুবিধার আওতায় এনেছে সংস্থাটি।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঝিলংজা ইউনিয়নের শেষাংশে রামুর চাকমারকুল ইউনিয়নের শুরু। মহাসড়ক থেকে নেমে জারাইতলী সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার গেলেই ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আহমেদপাড়া। এলাকাটি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে অনেকটাই বিপর্যস্ত। ঘনবসতিপূণ এলাকাটি দরিদ্র মানুষের সুপেয় পানি, স্যানিটেশনসহ উন্নত সেবা পাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো।
হাইসাওয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল ওসমান জানান,ডেনমার্ক সরকারের আর্থিক সহায়তা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যৌথতায় প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই পানি সরবরাহ সেবা চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কক্সবাজারে জলবায়ু ঝুঁকিপূণ মানুষের জন্য অভিযোজনমূলক প্রকল্প’। প্রকল্প ব্যয়ের ১০ শতাংশ অর্থাৎ দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন স্থানীয় উপকারভোগীরা।
সরজমিনের চাকমারকুল পূর্ব আহমেদ পাড়া ঘুরে দেখা যায়, পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয়েছে ৮১০ ফুট গভীর নলকূপ, আধুনিক মোটর। অবকাঠামো তৈরী করে ২০ ফিট উঁচুতে বসানো হয়েছে ৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক। পাইপলাইনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৫৫টি পরিবার সরাসরি পানি পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে ১০০ পরিবারকে এতে যুক্ত করা হবে। বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে এখানে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল।
কক্সবাজার নাগরিক ফরমের সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন,হাইসাওয়ার মতো অন্যান্য সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষের পানি সংকট মোকাবেলায়। তবে এখানে বড় ভূমিকা কিন্তু সরকারের। সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এ সংকট মোকাবেলা করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজারের বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন পরিবর্তিত।









