কোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের জন্য আদালতের দরজা খোলা রয়েছে বলে সর্বোচ্চ আদালতে এক শুনানিতে বললেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
বৃহস্পতিবার সকালে পাচ বিচারপতির আপিল বিভাগে এক মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি একথা বলেন।
এবিষয়ে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আমার মামলাটি শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি আমাকে বলেন যে, আপনি তো বারের নেতা, রাজনৈতিক নেতা আপনাদেরওতো কিছু দায়িত্ব আছে তাদের (কোটা নিয়ে আন্দলোনকারীদের) পরামর্শ দেয়ার। তারা নির্বাহী বিভাগের (সরকারের) কথা বলছে। নির্বাহী বিভাগের কোন সিদ্ধান্ত তো আবার আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাদের জন্য তো আদালতের দরজা খোলা রয়েছে। তারা যথাযথ ভাবে তাদের বক্তব্যে আদালতেই উপস্থাপন করতে পারে।’
এদিকে কোটা নিয়ে আইনী বিরোধের বিষয়বস্তুর ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থার (স্ট্যাটাসকো) আদেশের শুনানিতে গতকাল প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবাদকারীরা (কোটা নিয়ে আন্দোলনকারীরা) চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।’
প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান গতকাল বলেন, ‘এটা নিয়ে রাস্তায় নেমে যারা স্লোগান দিচ্ছেন সেটা এপ্রিশিয়েট করার মতো না। তবে আমার যা মনে হয় তারা ভুল বুঝেই এটা করেছে। যাই হোক তারা আমাদেরই ছেলে-মেয়ে। আমি প্রথম দিনেই বলেছি রাস্তায় স্লোগান দিয়ে আদালতের (জাজমেন্ট চেঞ্জ) রায় পরিবর্তন করা যায় না এটার জন্য (প্রপার স্টেপ) যথাযথ পদক্ষেপ নেন। আমি ধন্যবাদ জানাই যে দুটি ছেলে এসেছেন ( হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নিয়ে ) তাদের আইনজীবী শাহ মনজুরুল হককে। তারা অন্তত পক্ষে একটি যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে।’
প্রধান বিচারপতি গতকাল শুনানিতে বলেন, ‘রাতে টেলিভিশন যখন দেখি মনে হয় সমস্ত জ্ঞান তাদেরই। আর আমরা যারা এখানে বসে আছি আমাদের কোন জ্ঞানই নাই। এত কথা বলে উস্কানি দেওয়ারতো কোন মানে হয় না।’
কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের প্রসঙ্গে গতকাল প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এখন সেটা (রায়টি) সঠিক হয়েছে কি, হয় নাই তা দেখার অধিকারটা কার? সেটা দেখার অধিকার সুপ্রিম কোর্টের। একমাত্র আপিল বিভাগের। আমাদের ক্ষমতা আছে হাইকোর্টের রায়টি বাতিল করার বা না করার। আবার বলতে পারি হাইকোর্টের রায়টি ঠিক হয়নি বা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা কোনটা বলবো? রায়টি আমাদের সামনে না আসা পর্যন্ত তো তা বলতে পারছি না। আমার মনে হয় রায়টি আমাদের সামনে আসুক, রায়টি আসলে আমরা প্রপার মূল্যায়ন করবো।’
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বলে গতকাল প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সকল প্রতিবাদী কোমলমতী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে নিজ নিজ কাজে অর্থাৎ পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বলছি। আর দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্জ মহোদয়, প্রক্টোর ও অন্যান্য বিদ্যালয়ের প্রধানগণকে তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন বলে এই আদালত আশা করে।’
প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য গতকাল শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকারীরা চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারবেন। আর আদালত মূল দরখাস্তটি নিষ্পত্তি কালে তাদের বক্তব্যটি বিবেচনায় নিবে।’
সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে ঢাবির দুই শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্র পক্ষের করা আবেদনের শুনানি নিয়ে বুধবার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন পাচ বিচারপতির আপিল বিভাগ আদেশ দেন। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে কোটা নিয়ে আইনী বিরোধের বিষয়বস্তুর ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাসকো) দেয়া হয়। সেই সাথে হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল আদালতে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে দুই শিক্ষার্থীর আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। আর হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। আর হাইকোর্টে রায় প্রকাশের আগে সে রায় স্থগিত না করার পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের আন্দোলনের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করে। সেখানে বলা হয়েছিল, ৯ম গ্রেড (পূর্বতন ১ম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩তম গ্রেড (পূর্বতন ২য় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাতালিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। ওই পদসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হলো। যেখানে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৫ ও প্রতিবন্ধীর ১ শতাংশ কোটা বাতিল করা হয়।
এই পরিপত্রের মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ চ্যালেঞ্জ করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি অহিদুল ইসলাম তুষারসহ সাতজন হাইকোর্টে রিট করেন। সে রিটের শুনানি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সে রুল যথাযথ ঘোষণা করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে গত ৫ জুন রায় দেন হাইকোর্ট।
এখনো প্রকাশিত সে রায় স্থগিত চেয়ে প্রথমে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরবর্তীতে রায় স্থগিত চেয়ে গতকাল নতুন করে আরেকটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আল সাদী ভূঁইয়া ও উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ সাঈদ খান। এই দুই আবেদনের শুনানি শেষে বুধবার স্ট্যাটাসকো আদেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত।
এদিকে হাইকোর্টের রায়ের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে গত ১ জুলাই থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।









