চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের ডিসি হতে ৭০ কোটি টাকা চুক্তি!

নথিতে চাঞ্চল্যকর দাবি

চট্টগ্রামের ডিসি হতে ৭০ কোটি টাকা চুক্তি বিষয়ক সংবাদে একজন কর্মকর্তা বসে আছেন।. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

ছবি: সংগৃহীত

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ পেতে ৭০ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ উঠেছে। চুক্তি, ব্যাংকের চেক এবং ব্যক্তিগত বার্তালাপের কিছু নথি পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ডেইলি ওয়াদা।

ডেইলি ওয়াদার জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব নথিতে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে পদটি বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথিতে থাকা কিছু দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি হন। তিনি চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার জন্য বিপুল অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নথিতে কোটি কোটি টাকার ঋণ, নিরাপত্তা হিসেবে স্বাক্ষর করা চেক এবং চট্টগ্রামের ডিসি পদ নিয়ে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির উল্লেখ রয়েছে। ওই চুক্তিতে পদটি পেলে ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের শর্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন সালাহউদ্দিন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি করেন সালাহউদ্দিন। তখন তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

চুক্তিতে শাকিল খানের কাছ থেকে সালাহউদ্দিনের ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। কথিত ব্যবসায়িক সুযোগ ও চট্টগ্রাম বন্দরের কাজের সঙ্গে এই ঋণের সম্পর্ক ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সিটি ব্যাংকের দুটি চেক দেওয়া হয়। প্রতিটি চেকের মূল্য ছিল ২ কোটি টাকা।

চার কোটি টাকা মূল্যের দুটি চেক

এর কিছুদিন পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সালাহউদ্দিনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে বদলির আদেশ দেয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে কোনো শূন্য পদ ছিল না। পরে ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাকে কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে পদায়ন করা হয়।

পদ নিয়ে অসন্তোষের বার্তা

এরপর সালাহউদ্দিনের সঙ্গে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন সামনে আসে। সেখানে তিনি পাওয়া পদ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

কথোপকথনে তাকে বলতে দেখা যায়, তাকে একটি নির্দিষ্ট পদ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে পদাবনতি দিয়ে অন্য জায়গায় দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেকে ‘নিঃস্ব’ বলেও উল্লেখ করেন।

ওই বার্তালাপে সালাহউদ্দিন দাবি করেন, তার বদলির আদেশ কে করিয়েছেন, তিনি তা জানেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

তবে নথিগুলোতে ওই ব্যক্তির পরিচয় বা তিনি আদৌ নিয়োগে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন কি না, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ডিসি পদ নিয়ে ৭০ কোটি টাকার চুক্তি

বন্দর কর্তৃপক্ষে পদায়নের পরও চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গত ২৯ মার্চ সালাহউদ্দিন একটি লিখিত ঘোষণায় চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পেলে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন। একই নথিতে পটুয়াখালীর বাউফলের মো. হাবিবুর রহমানকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের কথা বলা হয়।

হাবিবুর রহমানকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সালাহউদ্দিনের পক্ষে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা করার ক্ষমতা দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এরপর ১৬ জুলাই তারিখের একটি নথিতে সালাহউদ্দিনের কথিত স্বাক্ষর পাওয়া যায়। সেখানে চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগের সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পদটি পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে ‘কাজের মাধ্যমে’ কীভাবে ওই অর্থ উপার্জন করা হবে, একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এটি কীভাবে আইনসঙ্গতভাবে সম্ভব এবং অর্থের চূড়ান্ত প্রাপক কে হবেন, সে বিষয়ে নথিতে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

আহমেদ এবং এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা আদান-প্রদান

১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার চেক

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ পাওয়ার কথিত প্রচেষ্টার সঙ্গে আরও বড় অঙ্কের আর্থিক নিশ্চয়তার নথি পাওয়া গেছে।

পর্যালোচনা করা নথিতে সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেকের উল্লেখ রয়েছে। এসব চেকের মোট মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এগুলো কথিত লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের বগুড়া করপোরেট শাখার পাঁচটি চেকের মোট মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মূল্য ৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সালাহউদ্দিন তার সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত চাকরির তথ্যসংবলিত কাগজপত্র এবং তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কথিত লেনদেনে মধ্যস্থতাকারীদের আশ্বস্ত করতেই এসব কাগজ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদের ইস্যু করা চেকসমূহ

অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। তার দাবি, তার মোবাইল ফোন হ্যাক হয়েছিল এবং তার চেক ও জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গিয়েছিল।

তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন পক্ষ কর্মকর্তাদের কাছে নিয়মিত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে যায়। যদিও তিনি কোনো পদ পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি।

তিনি জানান, এসব ঘটনার বিষয়ে তিনি পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এসব বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু নেওয়া উচিত ছিল। এটা আমার ভুল।’

পরে আমলাতন্ত্রের ভেতরে কথিত তৎপরতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষ নিয়মিত সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের কক্ষে কক্ষে গিয়ে নানা প্রস্তাব দেয়। এ ধরনের ঘটনা সেখানে সব সময়ই ঘটে এবং এখনো ঘটছে। এটা অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলেই আপনারা এসব নথি পেয়েছেন।’

তবে এসব মধ্যস্থতাকারী কারা, তারা কোন কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেছিলেন এবং নিয়োগে তাদের আদৌ কোনো প্রভাব ছিল কি না, সে বিষয়ে নথিপত্রে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটি গঠন

সালাহউদ্দিনের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি, বিভিন্ন চুক্তি, আর্থিক নিশ্চয়তা এবং কথিত বার্তালাপের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, একটি অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি ডেইলি ওয়াদাকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে তদন্ত কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।

বিষয়:৭০ কোটি টাকাচট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকডিসি
প্রতিবেদক

চ্যানেল আই অনলাইন

চ্যানেল আই অনলাইন

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…