নানা আনুষ্ঠানিকতায় সোমবার (১০ নভেম্বর) শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩০)। ব্রাজিলের আমাজন রেইনফরেস্টের প্রান্তে অবস্থিত সবুজ শহর বেলেমে দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলন শুরু হয়েছে।
সোমবার হাজার হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন সম্মেলনে, যা আয়োজিত হয়েছে একটি প্রাক্তন বিমানঘাঁটির স্থাপনায়, যেটি এখন ভারী এয়ার কন্ডিশনিংযুক্ত। অনেকে অবস্থান করছেন নদীর ধারে নোঙর করা ক্রুজ জাহাজে বা কনটেইনার আবাসনে।
গুয়াজাজার আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কূটনীতিকদের স্বাগত জানাতে নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করেন।
বিতর্কের পর অবশেষে দেশগুলো সোমবার সম্মেলনের কর্মসূচিতে একমত হয়েছে। এতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, দেশগুলো এখনও শিল্প-পূর্ব যুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য কাজ চালিয়ে যেতে পারবে কি না—এই প্রশ্নটি বিবেচনা করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারিতে থাকা দেশগুলোর জোট—অ্যালায়েন্স অফ স্মল আইল্যান্ড স্টেটস, যাদের অধিকাংশই ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ—তারা দীর্ঘদিন ধরে এই লক্ষ্য বজায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ নিজেও স্বীকার করেছে যে এই তাপমাত্রা সীমা অতিক্রম করা এখন “অপরিহার্য” হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিকভাবে অস্থির প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কোনো উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি পাঠায়নি। বিশ্বকে ‘‘জলবায়ু অস্বীকারবাদ’’ পরাজিত করতে হবে এবং ‘‘ভুয়া খবরের’’ বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে —সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমন আহ্বান জানিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
কপ৩০ সম্মেলনে এক উজ্জীবনী বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট লুলা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরোক্ষভাবে আক্রমণ করেন, যিনি গত সেপ্টেম্বর মাসে জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘‘প্রতারণা’’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট লুলা বলেন, ভুয়া খবর, বিকৃতি এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রত্যাখ্যানের যুগে— কপ৩০ হবে সত্যের কপ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম না নিয়েই লুলা বলেন, তারা অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করে, ঘৃণা ছড়ায় এবং ভয় তৈরি করে। এখন সময় এসেছে অস্বীকারকারীদের ওপর নতুন পরাজয় চাপিয়ে দেওয়ার।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জীবাশ্ম জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুক্তি দিয়েছেন যে এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে।
তার প্রশাসন নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য নির্ধারিত ১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি তহবিল বাতিল করেছে এবং দেশে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন নতুন এলাকা খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি কপ আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে, কারণ বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির অংশগ্রহণ ছাড়াই দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পথে অগ্রগতি আনতে হবে।
কিছু প্রতিনিধি আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধি পাঠিয়ে আলোচনা দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে। এ বছর অন্যান্য পরিবেশ-সংক্রান্ত আলোচনাও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ভেস্তে গেছে, যাকে অনেকেই জোরজবরদস্তিমূলক আচরণ বলে অভিহিত করেছেন।
বেলেমে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল প্রথমে আশাবাদী সুরে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু পরে তিনি দেশগুলোর মধ্যে ‘‘অকারণ ঝগড়া-বিবাদ’’-এর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে একটি দেশও এই বিলাসিতা বহন করতে পারে না—কারণ জলবায়ু বিপর্যয় জিডিপির ক্ষতি ঘটাচ্ছে।
ব্রাজিল চায় তার সভাপতিত্বের এই কপ সম্মেলনকে ব্যবহার করে পূর্ববর্তী বছরগুলোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে অগ্রগতি আনতে। এর মধ্যে রয়েছে—জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সরে আসা, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারির উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ।
প্রেসিডেন্ট লুলার মূল উদ্যোগ হলো “ট্রপিকাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি’’, এটি একটি তহবিল যা বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণের জন্য ১২৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে।
তবে তহবিল সংগ্রহ ধীর গতিতে শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শেষ মুহূর্তে জানিয়েছিলেন যে যুক্তরাজ্য সরকারি অর্থ থেকে এতে অবদান রাখবে না।
কিন্তু সোমবার যুক্তরাজ্যের জলবায়ু দূত র্যাচেল কাইট বলেন, এই তহবিল একটি “দারুণ ধারণা” এবং যুক্তরাজ্য “কোনো একসময়” এতে বিনিয়োগ করবে।









