প্রান্তিক নাটোরের চলনবিলের ভোরবেলা। ধানক্ষেতের উপর ভেসে থাকা কুয়াশা, কাদামাটির সরু আইল, চারপাশে বিলের পানি। সেই পথ মাড়িয়ে প্রতিদিন হাঁটতেন এক কিশোর—নগ্ন পায়ে, কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, মনে অদেখা এক জগৎ দেখার আকাঙ্ক্ষা। বিদ্যুৎহীন গ্রাম, পাকা রাস্তা সাড়ে তিন মাইল দূরে, আর প্রতিদিন দুই মাইল হেঁটে স্কুলে পৌঁছনো—এই ছিল তাঁর শৈশবের দৈনন্দিন।
সন্ধ্যায় ঘরের মাটির মেঝেতে হারিকেনের আলোয় চলতো সান্ধকালীন পড়ালেখা। ছোটবেলায় ছাগল চড়ানোর আনন্দে পড়াশোনার খাতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন কয়েক মাসের জন্য। পরে উপলব্ধি করলেন—জীবনের বইটা খোলা না রাখলে পথও বন্ধ হয়ে যায়। ফিরে এলেন স্কুলে, আর মাত্র তিন মাস পড়ে পঞ্চম শ্রেণির তৎকালীন সেন্টার পরীক্ষায় (বর্তমানের পি এস সি) ধর্মে ফেল করলেন।
মাধ্যমিকের শুরুতে তিনি খুব মনোযোগী ছাত্র ছিলেন না; ফলও খারাপ হতো নিয়মিত। কিন্তু বাবার মুখের এক কথাই যেন বদলে দিল জীবন:
বাহিরে গেছিস—নিজের চেষ্টায় উন্নতি কর। জীবনে যা করবি সেটাই তোর। আর জীবনে যদি কিছু না করতে পারিস, ফিরে আসিস আমি যা রেখে যাব তা দিয়ে হয়তো চলে যাবে
এই বাক্য যেন পাথরের মতো বসে গেল মনে। খারাপ সঙ্গ ত্যাগ, পড়াশোনায় সম্পূর্ণ মনোযোগ। ধীরে ধীরে বদলে গেল ফলাফল। ১৯৯৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় চারটি বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্কস পেয়ে গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে গেল খবর।
রাজশাহীর নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি পড়ার সময় এক বড় ভাইয়ের মুখে প্রথম শোনেন বুয়েটের নাম। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে ভর্তি হয়ে পূর্ণ করলেন স্বপ্নের অর্ধেক।
স্নাতক শেষে , কিন্তু উচ্চশিক্ষার টান তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দুই বছর চাকরির পর জার্মান সরকারের বৃত্তি (German Academic Exchange Service (DAAD)) নিয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন জার্মানি ও চিলিতে । দেশে ফিরে বুয়েটের ‘বুয়েট-জাপান ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার প্রিভেনশন অ্যান্ড আরবান সেফটি’-তে প্রভাষক হিসেবে যোগ। এর মাঝেই নেদারল্যান্ড ফেলোশিপ নিয়ে সার্টিফিকেট কোর্স করে আসেন Geospatial Technologies তে শিক্ষা ও গবেষণায় বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টুয়েন্টে এর আই টি সি থেকে। শিক্ষকতা করতে করতেই নিলেন নতুন প্রতিজ্ঞা—পিএইচডি করবেন, আর করবো বিশ্বমানের গবেষণা।
বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ সহ আরও কয়েকটি ফুল-ফান্ডেড অফার। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি সম্পন্ন করলেন; জিপিএ ৪-এর মধ্যে ৪, ১৬টি পিয়ার-রিভিউড জার্নাল, আর ২০২০ সালে ‘Outstanding Ph.D. Student Award’—অসাধারণ একাডেমিক যাত্রার এক পরম স্বীকৃতি।
এরপর শুরু হলো উজ্জ্বল কর্মজীবন। নিউ জার্সি সিটি ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক, তারপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ডেন্টাল মেডিসিনে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা। আমেরিকার স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে ডেন্টাল ক্লিনিকের অপ্রাপ্যতা নিয়ে তাঁর গবেষণা ‘ডেন্টাল ডেজার্ট’ নামে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে এবং ’জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত হয়।
আজ তিনি লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের স্কুল অফ পাবলিক হেলথে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি প্রোগ্রামে সহকারী অধ্যাপক এবং একই সাথে হার্ভার্ড বিশবিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মরত। ভূ-স্থানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কৃষি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছেন। নাসা, ইউএসএইড, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আগামী বছর গুলোতে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঢাকা শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ঝুকি নিয়ে কাজ করবেন।
ড. রহমান কেবল গবেষক নন; ছোটবেলা থেকে কবিতা আবৃত্তির প্রতি তাঁর ভালোবাসা আছে। তিনি কবিতা লেখেন না, কিন্তু আবৃত্তি করতে ভালোবাসেন—মঞ্চে, ক্লাসরুমে, কিংবা একান্ত সময়ে শব্দের সুরে তিনি খুঁজে পান একধরনের শক্তি।
আরেকটি ভালোবাসা ভ্রমণ—প্রকৃতি, স্থাপত্য আর ইতিহাসের সম্মিলন তাঁকে আকর্ষণ করে। বিশ্বের নানা প্রান্তে তিনি হেঁটেছেন, শুধু পর্যটক হিসেবে নয়, যেন এক পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকের চোখে পৃথিবীকে পড়তে। পেরুর মাচু পিচু, আইফেল টাওয়ার, লন্ডন ব্রিজের ছায়া, স্পেনের আলহাম্ব্রা প্যালেস, ভারতের লালকেল্লা, তুরস্কের প্রাসাদ, রোমের কলোসিয়াম, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, টিটিকাকা হ্রদের ভাসমান দ্বীপপুঞ্জ কিম্বা চিলির আতাকামা ম্রুভুমি —প্রতিটি স্থানে তিনি খুঁজেছেন ইতিহাসের রেখাচিত্র, মানুষের স্বপ্নের ছায়া আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মানচিত্র। এইসব অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণা ও পরিকল্পনায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে; প্রকৃতির বিস্তার আর শহরের নকশা একসাথে কেমনভাবে বেঁচে থাকে, সেটা বোঝার দৃষ্টি তিনি পেয়েছেন এই ভ্রমণ থেকেই।
যে ছেলেটি একদিন কাদামাটি আর পানিতে ভিজে স্কুলে যেত, পড়াশোনা ছেড়ে ছাগল চরিয়েছিল, হাইস্কুলের শুরুতে মনোযোগী ছিল না আর ফল খারাপ হতো—সে’ই আজ নিজের মেধা, অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে গর্বিত করছে। ড. মোঃ শাহীনূর রহমানের জীবন যেন এক জ্যান্ত প্রবাদ—স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকলে আর কঠোর পরিশ্রম করলে যেকোনো বাধাই অতিক্রম করা যায়। তাঁর গল্প কেবল সফলতার গল্প নয়; এ এক মানুষের ধৈর্য, পুনর্জন্ম আর পথ না থাকলেও পথ বানিয়ে নেওয়ার মহাকাব্য।
তরুণদের প্রতি তাঁর মূল বার্তা একটাই—পরিশ্রম, পরিশ্রম আর পরিশ্রম। জীবন খুব ছোট, তাই স্বপ্ন ছেঁটে ফেলো না—“Life is too little, never cut your dream.”
স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবিরাম ছুটে চলতে হবে। ব্যর্থতা আসবেই, হোঁচট খেতেই হবে, কিন্তু মনে রাখতে হবে—প্রতিটি হোঁচটই একটি নতুন শিক্ষা, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি, নতুন পথ আর নতুন অনুপ্রেরণা দেয়।
তিনি তরুণদের মনে করিয়ে দেন—জীবনে শর্টকাট বলে কিছু নেই। শিখতে শিখতে এগোতে হয়, কারণ জ্ঞান আর শিক্ষার ভিত্তি মজবুত না হলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি স্কুল পরিবর্তন করেছেন, ধানের জমি পেরিয়েছেন, গ্রামের ঘর ছেড়ে শহরে এসেছেন—সব কিছুতেই কষ্ট ছিল, কিন্তু অভিযোগ করেননি। বরং মানিয়ে নিয়েছেন, অভিযোজিত হয়েছেন, পিছু হটেননি। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার এই ক্ষমতাই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে এবং বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
অবশেষে তিনি তরুণদের বলেন—জীবনে প্রকৃত সন্তুষ্টি আসে অন্যের উপকারে লাগলে। তাই নিজের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের জন্যও কিছু করার চেষ্টা করতে হবে।












